রাজধানীতে হঠাৎ বেড়েছে ছিনতাই : জড়িয়ে পড়েছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী

0
787

মাসুদুর রহমান: আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতিতে রাজধানীতে বেড়েছে ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্য। ডিএমপির সবকটি থানায় অহরহ ঘটছে ছিনতাইয়ের ঘটনা। পেশাদার ছিনতাইকারীদের পাশাপাশি এসব অপরাধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের জড়িয়ে পড়ার অভিযোগও কম নয়। এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষের প্রাণ হারানোর ঘটনার পাশাপাশি আহত হয়েছেন পুলিশ সদস্যরাও। পুলিশি তৎপরতার অভাবে কিংবা তাদের যোগসাজশে নগরে ছিনতাই বাড়লেও উদাসীন কর্তৃপক্ষ। আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতিতে এসব ঘটনায় আতঙ্কে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে রাজধানীবাসী। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্যমতে, গত সেপ্টেম্বর মাসে রাজধানীতে ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসা নিয়েছে কমপে ২৫ জন। এর মধ্যে গোয়েন্দা সংস্থার একজন মাঠ কর্মকর্তাও আছেন। তবে প্রকৃতপে ছিনতাইয়ের ঘটনা এর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। কারণ অনেকে ঝামেলা এড়াতে ঢাকা মেডিকেল বা থানা পর্যন্ত যান না। পুলিশের ভাষ্যমতে, ছিনতাই প্রতিরোধে ঢাকার অনেক সড়ক ও বাড়িতে কোজ সার্কিট ক্যামেরা বা সিসিটিভি বসানো হয়েছে। পুলিশ ও র‌্যাবের পেট্রোল ডিউটি, ফুট পেট্রোল ও সাদা পোশাকে ডিউটির পাশাপাশি ছদ্মবেশে গোয়েন্দা নজরদারিও করা হচ্ছে। এরপরও দুর্র্ধর্ষ ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়েই চলেছে। গত ২৯ আগস্ট সকাল ১১টার দিকে রাজধানীর মিরপুরে শেরেবাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামের পাশে গুলি করে এক গরু ব্যবসায়ীর ১৭ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। গরু ব্যবসায়ী মালেক ফরাজীর বাসার সামনেই এ ঘটনা ঘটে। : ৮ অক্টোবর রাজধানীর টিকাটুলরি কে এম দাস লেনের ১২/২ নং বাসা থেকে মাত্র কয়েকশ গজ দূরে হুমায়ুন সাহেবের বাড়ির সামনে ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্সের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র আবু তালহা খন্দকার। ছিনতাইকারীরা তার মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেয়। একই স্থানে সাদিয়া নামের এক স্কুল শিকিা এবং তার ভাই সানির মোবাইল ও টাকা ছিনতাই করে ছিনতাইকারীরা। এসময় তালহা সাহস করে এক ছিনতাইকারীকে জাপটে ধরে চিৎকার দেয়। কিন্তু আশপাশের কেউ এগিয়ে না আসায় ছিনতাইকারীরা তালহাকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার কিছুণ পর তালহার মৃত্যু হয়। : এর আগে গত ১৯ সেপ্টেম্বর ভোর ৬টার দিকে টিকাটুলীর কে এম দাস লেনে রিকশা করে যাচ্ছিলেন এক ব্যক্তি। এ সময় মোটরসাইকেল আরোহী দুই ছিনতাইকারী তার রিকশার গতিরোধ করে। ছিনতাইকারীরা ধারালো অস্ত্র ঠেকিয়ে রিকশা আরোহীর টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়ার সময় তিনি চিৎকার দেন। এক পর্যায়ে তিনি রিকশা থেকে লাফিয়ে পড়ে দৌড় দেন। ওই সময় ছিনতাইকারীরা রিকশাচালক স্বপন মিয়ার পিঠে এলোপাতাড়ি কোপায়। তার চিৎকারে সরু গলির আশপাশ থেকে লোকজন বেরিয়ে এক ছিনতাইকারীকে ঘিরে ধরে মারধর শুরু করে। মোটরসাইকেল নিয়ে অপরজন পালিয়ে যায়। : ১১ অক্টোবর বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে রাজধানীর মগবাজার এলাকা দিয়ে রিকশায় যাওয়ার সময় ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে সঙ্গে থাকা সকল কিছুই হারান সময় নিউজের ইনচার্জ ইসরাফিল শাহীন। থানায় অভিযোগ জানাতে গিয়ে দেখতে পান একই সময়ে অভিযোগ জানাতে এসেছেন ছিনতাইয়ের শিকার আরও দুই ব্যক্তি। ১৭ অক্টোবর মঙ্গলবার মধ্যরাতে রাজধানীর খামারবাড়ি এলাকায় হিমেল খান নামে বিদেশগামী এক ব্যক্তির গাড়ি থামিয়ে দুটি মোবাইল ফোন, টাকা-পয়সা ও সঙ্গে থাকা মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে নেয় জসিম উদ্দিন নামে এক পুলিশের উপ-পরিদর্শক। ছিনতাইয়ের শিকার ব্যক্তি এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দিলেও তা নিয়ে গড়িমসি করছে থানা পুলিশ। : পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তের পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। একই দিন ডিবি পরিচয়ে ছিনতাই করতে গিয়ে জয়পুরহাটে ধরা পড়েছেন ছয় ব্যক্তি। অন্যদিকে একই দিন রাত ৩টার দিকে রাজধানীর হাজারীবাগের বেড়িবাঁধ এলাকায় ছিনতাইকারী ধরতে গিয়ে আহত হন পুলিশের উপ-পরিদর্শক ইমতিয়াজ ও কনস্টেবল গোলাম আজম। : ভুক্তভোগীদের মতে, এসব থানা বাদে ডিএমপির প্রতিটি থানায় প্রতিদিনই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে গত কয়েকদিনে ছিনতাই অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে। পুলিশ ছিনতাইকারীদের আটকের েেত্র ততোটা তৎপর নয় এবং কিছুেেত্র তারা মামলা নিতেও রাজি হন না বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। ছিনতাকারীদের কবলে পড়ে প্রাণ না হারালে পুলিশ অভিযুক্তদের ধরতে তেমন পদপে নেয় না, আর মামলা না নিয়ে সাধারণ ডায়েরি করলে ছিনতাইয়ের ঘটনার কোনো সুরাহাই হয় না বলেও অভিযোগ তাদের। : এ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহ এহসান হাবীব বলেন, স্বয়ং পুলিশের ছিনতাইয়ে সম্পৃক্ত হওয়ার ঘটনা সমাজের জন্য খুবই ভয়ংকর বিষয়। সমাজের নৈতিক অবয়, আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীর জবাবদিহিতার অভাব এবং ছিনতাইকারীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসায় অপরাধীরা আরও বেশি সাহস পেয়ে মেতে উঠছে অপরাধমূলক কর্মকান্ডে। এটা সমাজের শৃঙ্খলা নষ্ট করছে। এখনই এসব অপরাধ রুখতে না পারলে ভবিষ্যতে সমাজে আরও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিরি সৃষ্টি হবে। : গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, পেশাদার ছিনতাইকারীরা ধরা পড়ার পর খুব সহজেই আদালত থেকে জামিন পেয়ে যায়। পরে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। সায়েদাবাদ এলাকায় ছিনতাই করতে গিয়ে গোয়েন্দা পুলিশের হাতে ধরা পড়া এক ছিনতাইকারীর উদাহরণ টেনে ওই কর্মকর্তা বলেন, সম্প্রতি জেলহাজত থেকে ছাড়া পেয়ে এখন সে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। : ছিনতাই বেড়ে যাওয়া প্রসঙ্গে ডিএমপির উপকমিশনার মাসুদুর রহমান বলেন, রাজধানীর যে কোনো স্থানে ছিনতাই, ডাকাতিসহ সব ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে ঢাকা মহানগর পুলিশ তৎপর আছে। নগরীকে নিরাপদ রাখতে সব ধরনের নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। পুলিশি টহল, তল্লাশি, ফুট পেট্রোল, মোটরসাইকেল পেট্রোল ডিউটি চলছে। বিভিন্ন এলাকা সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে মনিটরিং করা হচ্ছে। এরপরও অপরাধীরা কিছু কিছু েেত্র সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করছে। তাদেরকে গ্রেফতারসহ আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। দিনকাল

মন্তব্য করুন