সবকিছুর দাম বৃদ্ধিতে ঋণ করে চলছে মানুষ

0
941

জীবনযাত্রার ব্যয়ভার নিয়ে বড় কষ্টে আছে শহর ও গ্রামের মানুষ। সবকিছুর দাম বৃদ্ধিতে খরচও বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে কেউ চলছে সঞ্চয় ভেঙে আর কেউ চলছে ঋণ করে। মানুষের এই কষ্টকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ায় বেড়ে চলছে বেকার মানুষের সংখ্যা। সেই সাথে প্রবাসী আয় বা রেমিটেন্সে একটা বড় ধস নেমেছিল যার প্রভাব পড়েছে সর্বক্ষেত্রে। তাছাড়া বছর শেষে বাড়বে বাড়িভাড়া, যা মানুষের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। বিভিন্ন সংস্থার জরিপেও উঠে এসেছে মানুষের কষ্টের কথা। : লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে চালের দাম। মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকায়। বেশির ভাগ সবজি ও তরিতরকারি ৭০ থেকে ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হচ্ছে। কাঁচামরিচ ১২০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। এ অবস্থায় খরচের চাপে বেসামাল স্বল্প আয়ের লোকজন। ফলে ঋণ করে চলতে হচ্ছে মানুষের। বিশেষ করে এলাকার মুদি দোকানগুলোতে বাকি বিক্রি বেড়ে গেছে। নদ্দার মুদি দোকান বিসমিল্লাহ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আরিফ হোসেন গণমাধ্যমেকে বলেন, গত কয়েক মাসে তার দোকানে বাকি কেনাবেচা বেড়েছে দ্বিগুণের চেয়েও বেশি। তাছাড়া নগদ কেনাবেচাও কমে গেছে তার দোকানে। ওই দোকানি বলেন, ‘আগে যে ক্রেতা মাসে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা বাকি নিত এখন নিচ্ছে তিন থেকে চার হাজার টাকা। সময়মতো টাকা পরিশোধও করছে না। টাকা চাইলে বলে ভাই, কী করব, টাকা নাই।’ ওই দোকানি আরো বলেন, ‘বেচাকেনা কমে যাওয়ায় আমার দোকানের মুনাফাও কমে গেছে। আগে যে ক্রেতা একবারে দুই কেজি করে পেঁয়াজ নিত এখন সে নিচ্ছে এক কেজি করে।’ : অন্যদিকে বিপদ মুহূর্তের জন্য সঞ্চয় করে রাখা অর্থ ভেঙে খাচ্ছে মানুষ। গত বৃহস্পতিবার দিলকুশায় একটি ব্যাংক শাখায় মাসিক সঞ্চয়ী স্কিম ডিপিএস ভাঙাতে আসেন আদর আলী। আড়াই বছর ধরে ৫০০ টাকা করে প্রতি মাসে জমা করেছেন তিনি। আদর আলী বলেন, ‘তিন বছর মেয়াদে জমা করতে পারলে ভালো মুনাফা পেতাম। কিন্তু টাকার টানাটানিতে মেয়াদপূর্তি হওয়ার আগেই ডিপিএসটা ভাঙিয়ে ফেলতে হলো আমাকে।’ বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট মাস শেষে দেশের ব্যাংকগুলোতে মেয়াদি আমানতের স্থিতি ছিল সাত লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। এক বছর আগে অর্থাৎ ২০১৬ সালের আগস্ট মাসে এর পরিমাণ ছিল সাত লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকগুলোর মেয়াদি আমানত বেড়েছে মাত্র ৮.৭৩ শতাংশ। ২০১৬ সালের আগস্টে এই হার ছিল ১২.০৮ শতাংশ। এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে মেয়াদি আমানত বৃদ্ধির হার কিভাবে কমছে। কেবল মেয়াদি আমানতই নয়, তলবি বা যেকোনো সময় তুলে নেয়ায় আমানত বৃদ্ধির হারও কমছে। গত আগস্টে তলবি আমানত বৃদ্ধির হার ছিল ১০.৮০ শতাংশ। অথচ এক বছর আগে (আগস্ট ২০১৬) তলবি আমানত বৃদ্ধির হার ছিল ২৩.৮২ শতাংশ। : বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত সর্বশেষ খানা আয়-ব্যয় জরিপেও বলা হয়েছে, গ্রামের মানুষের গড় মাসিক আয়ের চেয়ে গড় মাসিক ব্যয় বেশি। এই অবস্থায় গ্রামে থাকা স্বল্প আয়ের মানুষকে ঋণ করে চলতে হচ্ছে। স্থানীয় সমিতির কাছ থেকে টাকা ধার নিতে হচ্ছে। : বিবিএস-এর প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সাল শেষে গ্রামের মানুষের গড় মাসিক আয়ের চেয়ে গড় মাসিক ব্যয় হয়েছে বেশি। ২০১৬ সালে গ্রামীণ এলাকার প্রতি পরিবারের গড় মাসিক আয় ছিল ১৩ হাজার ৩৫৩ টাকা। আর তাদের মাসিক গড় ব্যয় করতে হয়েছে ১৪ হাজার ১৫৬ টাকা। বিবিএস ২০১৬ সালের এপ্রিল থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত সময়ে সারাদেশের ৪৬ হাজার ৮০টি পরিবারের আয়-ব্যয়ের ওপর এ জরিপ চালিয়েছে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষক ড. জায়েদ বখত গণমাধ্যমে বলেন, ‘শহরে যেভাবে শিল্প-কারখানা বা অবকাঠামো গড়ে ওঠে, গ্রামে সেভাবে ওঠে না। ফলে গ্রামের মানুষের যে পরিমাণ কর্মসংস্থান হওয়ার কথা, সেটা হয়নি। আবার বিবিএস-এর জরিপ চলাকালে গ্রামের মানুষ তাদের উৎপাদিত পণ্য ন্যায্য দামে বিক্রি করতে পারেনি। ফলে গ্রামে আয়ের চেয়ে ব্যয় বেড়েছে।’ বিবিএস-এর তথ্যমতে, গ্রামের মানুষের ৫০ দশমিক ৪৯ শতাংশ ব্যয় করতে হয় খাদ্য ও পানীয়ের পেছনে। সাড়ে ৭ শতাংশ ব্যয় হয় পোশাক ও জুতার পেছনে, ৯ দশমিক ৮০ শতাংশ আবাসন ও বাড়িভাড়ায়, জ্বালানিতে ব্যয় হয় ৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ, চিকিৎসায় ৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ এবং শিক্ষায় গ্রামের মানুষের ৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ ব্যয় করতে হয়। বিবিএস-এর জরিপ অনুযায়ী, সার্বিকভাবে শহরের একটি পরিবার এখন গ্রামের একটি পরিবারের তুলনায় প্রায় গড়ে ৭০ শতাংশ বেশি আয় করে। শহরের পরিবারের গড় আয় ২২ হাজার ৫৬৫ টাকা। আর গ্রামের পরিবারের গড় আয় ১৩ হাজার ৩৫৩ টাকা। : বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন গণমাধ্যকে বলেন, ‘বিবিএস যে সময়ে জরিপটি চালিয়েছে, ওই সময়টিতে প্রবাসী আয় বা রেমিটেন্সে একটা বড় ধস নেমেছিল। আবার একই সময়ে দেশে কর্মসংস্থানও বাড়েনি। ফলে গ্রামের মানুষের আয়ের চেয়ে ব্যয় তখন বেশি করতে হয়েছে।’ তিনি উল্লেখ করেন, ‘রেমিটেন্স মূলত গ্রামের মানুষের কাছে যায়। আর আগে যেহেতু গ্রামের মানুষ রেমিটেন্স থেকে খরচ বৃদ্ধি করেছিল, হঠাৎ রেমিটেন্সে ধস নামায় তারা বিপাকে পড়ে। বাধ্য হয়ে তাদের ধার করতে হয়েছে, অথবা সঞ্চয় ভেঙে খেতে হয়েছে।’ : বিবিএস-এর তথ্যমতে, বর্তমানে দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ২০ লাখ। এর মধ্যে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা রয়েছে ৩ কোটি ৯৩ লাখ। হতদরিদ্রের সংখ্যা ২ কোটি ৮ লাখ। ২০১৬ সালের শেষে দেশের মোট জনসংখ্যার ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ দরিদ্র ছিল। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সামগ্রিকভাবে দারিদ্র্যের হার কমলেও এখনও দেশের সাতটি জেলার অধিকাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। বিবিএসের হিসাবমতে, দেশের সবচেয়ে বেশি গরিব মানুষ রয়েছে উত্তরাঞ্চলের কুড়িগ্রাম জেলায়। এ জেলার ৭০ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ এখনও দরিদ্র। দিনাজপুরে ৬৪ দশমিক ৩ শতাংশ, জামালপুরে ৫২ দশমিক ৫ শতাংশ, কিশোরগঞ্জে ৫৩ দশমিক ৫ শতাংশ ও মাগুরায় ৫৬ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ দরিদ্র। বান্দরবানের ৬৩ দশমিক ২ শতাংশ ও খাগড়াছড়ির ৫২ দশমিক ৭ শতাংশ জনগোষ্ঠী দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। : : : দিনকাল রিপোর্ট

মন্তব্য করুন