এসআই মফিজুল ইসলামের জীবনের সাফল্য গাঁথা গল্প

0
4861

জাহিদুল ইসলাম জীবন: অবসর প্রাপ্ত পুলিশ কনস্টেবল মো: হযরত বেলালের ১ম ছেলে সন্তান মো: মফিজুল ইসলাম (বাবু)। জন্মের পর বাবু বলে ডাকতে ডাকতে গ্রামে নাম বাবু আজও প্রচলন আছে। তার বাবা নিতান্তই সাধারণ একজন মানুষ। তার বাবা মনে করেন মফিজের সুনাম এমনি এমনিই হয়ে যায়নি। এজন্য করতে হয়েছে কঠোর পরিশ্রম। পরিশ্রমই এনে দেয় সফলতা। পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই।

মফিজুল ইসলাম জম্ম গ্রহণ করেন জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ী উপজেলার পারপাড়া গ্রামে। যে গ্রামটি ১৯৭১ সালে যুদ্ধের সময় পাকহানাদার বাহিনী পুরে ছাই করে দিয়ছিল। স্কুল জীবন থেকেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ভাষন তাকে উজ্জীবিত করে। সেই থেকে নিজেকে দেশ সেবার জন্য তৈরী করেন। শেখ মুজিবের আদর্শে নির্দলীয়ভাবে চাকুরীর পাশাপাশি গ্রামের মানুষকে শিক্ষিত ও দরিদ্র মুক্ত করতে কাজ করে যাচ্ছেন।

মফিজুল ইসলামের বাবা হযরত বেলাল তার ফেলে আসা কষ্টের দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে বলেন, আমি নিজে পুলিশের কনস্টেবল ছিলাম। এমনও দিন গেছে আমাকে পুলিশের পোষাক পরে ২৪ ঘন্টার মধ্যে ১৮ ঘন্টাই কাজ করতে হয়েছে । নিজের ছেলে-মেয়েদের সফলতা জন্য। ৬ ছেলে- মেয়ের মধ্যে আমার ১ মাত্র ছেলে ছিল মফিজুল ইসলাম। তাকে নিয়ে আমি স্বপ্ন দেখতাম। এতো সুনামের সাথে সে দায়িত্ব পালন করবে এবং সবার মনে জায়গা করে নিবে এটাই সব সময় ভাবতাম। মফিজুলের জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন তার বাবা হযরত বেলাল। হযরত বেলাল ৫ মেয়ে মধ্যে ২ জনকে বিয়ে দিয়েছেন পুলিশের কাছে আর বাকী ৩ জনের স্বামী ব্যবসা করেন।

মফিজুলের বাবা বলেন, সবাই আমার সততা এবং মেয়েদের স্বভাব চরিত্র ভাল দেখে স্কুল জীবনেই বিনা যৌতুকে মেয়েদের বিয়ে করিয়ে আত্মীয়তা করে নিয়েছে। তার বাবা আরো বলেন, মফিজ পুলিশের চাকরী করে দেশের মুখ এতো উজ্বল করবে সেটা আমি কখনো ভাবী নাই। খেলাধুলার প্রতি ছোট কাল থেকে তার অনেক নেশা ছিল। স্কুলের কথা বলে আমার কাছ থেকে টাকা নিত। পরে সেই টাকা দিয়ে সহপাঠিদের খেলার সরজ্ঞাম কিনে দিত। মফিজ তার নিজ হাতে লেখা বিভিন্ন দোয়া মসজিদে টাঙ্কিয়ে দিতেন। যখন ৩য় মেয়েকে বিয়ে দেই তখন আমার সংসারে একটু টানাটানি ছিল। এসব দেখে একদিন দুপুড়র মফিজ বললো বাবা আমি চাকরী করবো। এই কথা শোনে তার বাবা হযরত বেলাল তাকে জমালপুর পুলিশ লাইনে কনস্টেবল পদে লাইনে দাড়িয়ে দিল। সব কিছু পরিক্ষা দিয়ে মফিজ প্রথম হয়ে চাকরী পেয়ে গেল পুলিশ কনস্টেবল পদে। আস্তে আস্তে চাকুরী জীবনের সফলতার মাধ্যমে পদোন্নতি লাভ করেন মফিজ। বর্তমানে আমার কোন অভাব নেই। এটা সৃষ্টির কর্তার দান। কেহ বলতে পারবেনা, মহান সৃষ্টিকর্তা কখন কাকে কি করে। আমি নিজে পেনশন পাইতেছি এখন আর কোন কষ্ট নাই আমার জীবনে।

মফিজুল ইসলাম জামালপুর জেলা হতে ২৯/০৯/২০০২ কনস্টেবল পদে পুলিশে যোগদান করেন। তার প্রথম কর্মস্থল কুস্টিয়া জেলায়। তখন কুষ্টিয়া পুলিশ সুপার ছিলেন আঃ সালাম পিপিএম। পুলিশের চাকুরি কালেই কম্পিউটার প্রশিক্ষন গ্রহন করেন তিনি। তখন জানতেন না হয়তো এই কম্পিউটার তার জীবনের সাফল্য এনে দিবে। পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রস্তুতি। এই কাব্যটি একমাত্র মনে হয় মফিজুল ইসলাম কে দেখিছি। তিনি ২০০৯ সালে তিনি ঝিনাইদহ জেলায় কর্মরত থাকা কালে এসপি রেজাউল করিম পিপিএম কর্তৃক মনোনীত হয়ে মোবাইল ট্র্যাকিং উপর প্রশিক্ষন গ্রহন করেন এবং পরিশ্রম করে কম্পিউটারে তথ্য প্রযুক্তির কাজ শিখেন। প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর কম্পিউটার নিয়ে বসে পড়ে কাজে। সাফল্য আনতে বেশিদিন সময় লাগেনি এই পুলিশ কর্মকর্তার। নিজের মেধা ও বুদ্ধি দিয়ে ২০০৯ সালে এসআই মিরাজুল ইসলাম এর হত্যার রহস্য উদঘাটনের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করেন মফিজুল ইসলাম। এই হত্যা মামলা রহস্য উৎঘাটন করেই পুলিশের উচ্চ কর্মকর্তাদের চোখে পড়েন। এতে পুরোস্কার লাভ করেন তৎকালীন পুলিশ অফিসারের কাছ থেকে। পরে আর তার পিছনের দিকে তাকাতে হয় নি। একর পর এক সাফল্য তার হাতে ধরা দিয়েছে। অনেক পুলিশ কর্মকর্তা বলে তার হাতে জাদু আছে। সে যে কাজেই হাত দেয় সে কাজেই সাফল্য ছিনিয়ে নিয়ে আসে। এরপর ২০১০ সালে কনস্টেবল থেকে এএসআই পদে পদোন্নতি লাভ করেন মফিজুল ইসলাম।

২০১২ সালের আগস্ট মাসে ময়মনসিংহ জেলার ডিবিতে যোগদান করেন। এবং এসপি মঈনুল হকের তত্ত্াবধানে কাজ করে একাধিক হত্যা, ডাকাতি, অপহরণ, চাদাবাজি, চুরি, দস্যুতা মামলার রহস্য উদঘাটন, আসামী গ্রেফতার, লুন্ঠিত ও চোরাই মালামাল উদ্ধারসহ ২০১৩-২০১৪ সালের নাশকতামুলক কাজের রহস্য উদঘাটন করে জড়িত আসামীদের গ্রেফতার করেন। ময়মনসিংহ বড় বড় মাদক সম্ম্রাটদের গ্রেফতার করেন। তার কাজের সাফল্যের জন্য ময়মনসিংহের মানুষের কাছে বেশ প্রশংসা কুড়ান মফিজুল ইসলাম। ২০১৪ সালে পুলিস সপ্তাহে আইজিপি পদক লাভ করেন। তার কাজের দক্ষতা ও মেধায় ২১/০৫/২০১৫ ইং তারিখে এসআই পদে পদোন্নতি লাভ করেন। এছাড়া গত ২১ ডিসেম্বর ২০১৪ ভালুকার ৪ মার্ডার উদঘাটন ও ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৫ চলন্ত গাড়ী হতে ডাকাতেদর গাড়ীতে গুলি করে ২ ডাকাতকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় অস্ত্রশস্ত্রসহ গ্রেফতার করে ২০১৬ সালের পুলিশ সপ্তাহে পিপিএম সাহসিকতা লাভ করেন। নামের পাশে যোগ করেন ৩টি অক্ষর পিপিএম। হয়ে গেলেন মফিজ থেকে মফিজুল ইসলাম (পিপিএম)। একজন মানুষের সাফল্য লেখে শেষ করা যাবেনা তিনি হলেন পুলিশের এসআই মফিজুল ইসলাম পিপিএম।

মফিজুল ইসলাম পিপিএম এর সাথে কথা বললে তিনি বলেন….. এ পৃথিবীর আলো বাতাসসহ যা কিছু আজ আমার ভোগ করার সৌভাগ্য হয়েছে তার পেছনে যে মানুষটির ভূমিকা অপরিসীম সে মানুষটি হলো আমার জন্মদাতা বাবা। শিশুকাল থেকে শুরু করে বাবা কখনো খেলার সাথী হয়ে কখনো পরার টেবিলে শিক্ষক হয়ে, আবার কখনো আমার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়তে দিক-নির্দেশক হয়ে অবদান রেখে গেছেন। আমি যখন কোন সাফল্য অর্জন করি বাবা আনন্দে উৎফুল্ল হয় তার সেই স্বপ্নগুলো পূরণ হবে এই প্রত্যাশায়।

আপনার শেষ ইচ্ছা কি? আমার শেষ ইচ্ছা হলো মানুষের ভালোবাসা অর্জন করা এবং এটা মৃত্যু পর্যন্ত ধরে রাখা। কারন স্বাধীনতা অর্জনের চাইতে রক্ষা করা কঠিন। বিভিন্ন সফলতা অর্জন ১টি ব্যর্থতার দায়ভার ধুলিশ্বাত করে দেয়। তাই মানুষের দোয়ায় যেন সকল ব্যর্থতাকে কাটিয়ে উঠতে পারি এই প্রত্যাশা করি।

চিন্তা করেছি যদি পরিশ্রম করে যাই আর লক্ষ ঠিক রাখি তাহলে সফলতা একদিন আসবেই। কঠোর পরিশ্রম করার কারণে সফলতা আসতে বেশীদিন লাগেনি। কর্মজীবনে যেমন, সংসারজীবনেও তেমন সফল তাঁর। দক্ষতা, কর্তব্যনিষ্ঠা, সততা, সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষা ও শৃঙ্খলামূলক আচরণের মাধ্যমে প্রশংসনীয় অবদান তার।

পুলিশের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখি কুরআন তেলওয়াত করতে? অনেকে বলে আমার কন্ঠ অনেক সুন্দর। আপনে কি কোন মাদ্রাসায় পড়েছেন? না। আমার মা বাবার আদর্শে নিজেকে ইসলাম মনা এবং ধর্মান্ধ হয়ে নবী মোহাম্মদ (সঃ) এর আদর্শে জীবন গড়ার স্বপ্ন দেখি। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার পর তাবলীগ জামাতে গিয়ে সহী কোরআন ও নামাজ শিক্ষা লাভ করি।

আপনার সাফল্যের রহস্য কি? সফল হতে হলে প্রথমে দরকার সততা। তারপর সঠিক লক্ষ এবং তা বাস্তবায়ন করার স্পৃহা ও কঠোর পরিশ্রম। যদি কেউ সুশিক্ষিত হয় এবং লক্ষ ঠিক করতে পারে তাহলে অবশ্যই সে সফল হবে। অন্যরা বিশ্বাসঘাতকতা করলেও নিজের কাজ আর পরিশ্রম নিজের সাথে কখোনোই বিশ্বাসঘাতকতা করেনা। পরিশ্রম অবশ্যই সফলতা এনে দেবে।

আপনার কি ভয় করে না ? ভয়কে করেছি জয়। জয় করেছি বলেই সাফল্য এসেছে। পুলিশের চাকরীতে ভয় বলতে কোন শব্দ নেই।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে এতো কাছ থেকে দেখবেন কখন কি ভাবা হয়েছিল? যে দিন পদক পাওয়ার কথা প্রথম শুনেছি সে দিন অনেক আনন্দ পেয়েছি। আসলে সে অনুভূতির কথা সত্যি বলে বুঝাতে পারবোনা। যখন সামনে থেকে দেখছি তখন সত্যি বিশ্বাস হচ্ছিলনা।

আপনার চোখে দেখা একজন পুলিশ কর্মকর্তার কথা বলেন? আমার চোখে দেখা একজন পুলিশ হলো বর্তমানে নারায়নগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপার মঈনুল ইসলাম স্যার। যার দিক নির্দেশনায় আমি অনুপ্রানিত হই।

আপনার প্রিয় খাবার কি? আমার প্রিয় খাবার ডিমবাজি, মাছ বাজি ও ভাত।

মফিজুল ইসলাম পিপিএম বর্তমানে নারায়নগঞ্জ জেলার ডিবিতে কর্মরত আছেন। সেখানেও তার সাফল্যের কমতি নেই। বিশেষ করে অস্ত্র উদ্ধার ও মাদক উদ্ধারে।

মন্তব্য করুন