‘ডাক্তার হতে ডিগ্রি লাগে না, অভিজ্ঞতাই আসল’

0
783

কুমিল্লা জেলা সদরসহ উপজেলা পর্যায়ে বাড়ছে ভুয়া ও হাতুড়ে ডাক্তারদের সংখ্যা। এসব ভুয়া ও হাতুড়ে ডাক্তারদের অধিকাংশই মনে করেন ডাক্তার হতে ডিগ্রি লাগে না, অভিজ্ঞতা থাকলেই হয়।

এ বিষয়ে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার বাগমারা পূর্ব বাজার এলাকার ডাক্তার মো. আলী নেওয়াজ রাজু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি ২০০০ সাল থেকে হাড়ভাঙা রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে আসছি। কুমিল্লা, নোয়াখালী ও চাঁদপুরে আমার বেশ পরিচিতি রয়েছে। আমি শত শত রোগীকে চিকিৎসা সেবা দিয়েছি। কত বড় বড় শিক্ষিত মানুষকে আমি হাড়ভাঙা, পোড়া ও মচকানোর চিকিৎসা দিয়েছি। কেউ আমার ডিগ্রি আছে কিনা জানতে চাননি। আসলে ডাক্তার হতে ডিগ্রি লাগে না, অভিজ্ঞতাই আসল।’

আপনার কোনও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা অভিজ্ঞতাপত্র আছে কিনা- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ওসব কাগজপত্র লাগে না। অভিজ্ঞতাই হলো বড় কথা। আমার অনেক অভিজ্ঞতা আছে, কিন্তু কোনও অভিজ্ঞতাপত্র নেই।’

সরেজমিন কুমিল্লা বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অনেক ডাক্তারের কোনও ডিগ্রি না থাকলেও তারা নামের আগে ডা. বসিয়ে অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞ হিসেবে রোগী দেখছেন। রোগী দেখেই তারা বলে দিতে পারেন রোগ সারাতে কত টাকা প্রয়োজন। প্রতিদিন গ্রাম থেকে চিকিৎসা নিতে আসা অসংখ্য মানুষ এসব ডাক্তারদের কাছে প্রতারিত হচ্ছেন।

এইসব ডাক্তার চিকিৎসাপত্র ও প্যাডে ব্যবহার করছেন নামকরা রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের নাম। ভিজিটিং কার্ড ও প্যাডেও নামের আগে তারা ডা. শব্দটি ব্যবহার করছেন। সুসজ্জিত চেম্বার, আকর্ষণীয় নেমপ্লেট ও সাইন বোর্ড বসিয়ে প্রতারণা করে মন জয় করছেন রোগীদের।

ওই এলাকার ডা. মো. আলী নেওয়াজ রাজু নিজেকে হাড়ভাঙার বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দাবি করেন। তবে তার প্রেসক্রিপশন লেখেন পাশের ‘আল-আমিন মেডিক্যাল হল’ নামের এক ফার্মেসির মালিক।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মো. আলী নেওয়াজ রাজু মূলত একজন কবিরাজ। তিনি এলাকায় একজন হাড়ভাঙা চিকিৎসক হিসেবে বেশ পরিচিত। তবে তার চেম্বারের কোনও সাইনবোর্ড বা ব্যানার নেই। একটি আবদ্ধ অন্ধকার রুমে বসেই তিনি হাড়ভাঙা রোগীদের চিকিৎসা দেন। চেম্বারের ভেতরে রয়েছে একটি চৌকি আর একটি টেবিলের সঙ্গে দুটি বসার টুল। তাছাড়া চিকিৎসক রাজুর সঙ্গে থাকা ৯/১০ বছরের একটি শিশু ওই হাড়ভাঙা রোগীদের সেবা দিচ্ছেন। শিশুটিও বলতে পারে হাড়ভাঙা জন্য কী কী চিকিৎসা দিতে হয়। এলাকায় তার বিশাল দালাল চক্র আছে।

রতারণার শিকার হওয়া আফিয়া অভিযোগ করে বলেন, ‘চলতি বছরের জুনে হাড়ভাঙা চিকিৎসক ভেবে এখানে এসেছিলাম। কোনও ধরনের এক্সরে ছাড়াই মালিশ করে আমার ব্যথা জায়গাটায় ব্যান্ডেজ করে দেন। পরে প্রেসক্রিপশনে কিছু ওষুধ লিখে দেন। অল্প কয়েকদিন ব্যথা কম থাকলেও পরবর্তীতে যন্ত্রণা বাড়তে থাকে। পরে উন্নত চিকিৎসা নিতে হয়েছে আমাকে। আমি আর্থিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি।’

আরেক ভুক্তভোগী মাসুমা আক্তার জানান, আমি পড়ে গিয়ে পায়ে ব্যাথা পেয়েছিলাম। পরে হাড়ভাঙা ডাক্তার আলী নেওয়াজের ওখানে যাই। তিনি আমার পায়ের চিকিৎসা করে ওষুধ দিয়ে বলেন, ভালো হয়ে যাবে। কিন্তু কিছুদিন পর আমার পায়ের ব্যাথা বেড়ে যায়।

এ ব্যাপারে কুমিল্লা জেলার ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. কামাল উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এমবিবিএস এবং ব্যাচেলর অব সার্জারি ছাড়া হাড়ভাঙা রোগীদের চিকিৎসা কেউ করতে পারবে না। তবে যারা পল্লী চিকিৎসক তারা মাত্র প্রাথমিক চিকিৎসাটা দিতে পারেন। চিকিৎসার নামে যিনি বা যারা রোগীদের সঙ্গে প্রতারণা করছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া তদন্ত করে ওইসব ডাক্তার ও চেম্বারে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে এবং ভুয়া ডাক্তারদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে সোপর্দ করা হবে।’

মন্তব্য করুন