সাংবাদিকদের নিরাপত্তাহীনতায় বাংলাদেশের অবস্থান দশম

0
1258

বিশ্বে কমপক্ষে ১২টি দেশে সাংবাদিকদের নিরাপত্তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। কর্তৃপক্ষের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা সহিংস সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো তাদের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। এ তালিকায় দশম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দায়মুক্তির হার পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও নাইজেরিয়ায়। সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষায় নিয়োজিত কমিটি ফর দ্য প্রটেকশন অব জার্নালিস্টস (সিপিজে) প্রকাশিত গ্লোবাল ইমপিউটি ইনডেক্স বা বৈশ্বিক দায়মুক্তির সূচকে এসব কথা বলা হয়েছে। এতে বিশ্বের ১২টি দেশে সাংবাদিক হত্যা ও তার দায়মুক্তির প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়।

বলা হয়েছে, খুনিরা কৌশলে বিচারের হাত থেকে রক্ষা পায়। একদশক আগে এই সূচক প্রণয়ন শুরু হয়। তারপর থেকে প্রতি বছরই এ তালিকায় থাকে এমন সাতটি দেশ এবারের তালিকায়ও আছে। এর মধ্যে রয়েছে সোমালিয়া। সাংবাদিক হত্যার মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া সবচেয়ে বাজে দেশের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে এ দেশটি। এতে বলা হয়েছে, সংঘাতময় পরিবেশে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হামলার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। সে পরিবেশে শক্তিধররা মিডিয়া কাভারেজ নিয়ন্ত্রণ করতে সহিংস ভীতি প্রদর্শন করে। থাকে দুর্বল ও অকার্যকর আইনশৃঙ্খলা। গত এক দশকে সোমালিয়ায় হত্যা করা হয়েছে দুই ডজনেরও বেশি সাংবাদিককে। দীর্ঘমেয়াদি গৃহযুদ্ধের কারণে এর বিচার হয়নি। অন্যদিকে গৃহযুদ্ধের কারণে সিরিয়াকে এই তালিকার দ্বিতীয় স্থানে আনা হয়েছে। গত বছরও এ দেশটি এই অবস্থানে ছিল। তৃতীয় স্থানে রয়েছে ইরাক। সেখানে আইএস, রাষ্ট্রসমর্থিত মিলিশিয়া ও অন্যান্য গ্রুপ সাংবাদিকদের ভীতি প্রদর্শন করে। দক্ষিণ সুদানে রাজনৈতিক বিভিন্ন মহলের মধ্যে চলছে যুদ্ধ। ২০১৫ সালে সেখানে হামলায় নিহত হন কমপক্ষে ৫ জন সাংবাদিক। তবে কর্তৃপক্ষের নাগালের বাইরে থেকে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো; এমন তিনটি দেশ হলো- পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও নাইজেরিয়া। এ দেশগুলোয় দায়মুক্তির হারও উচ্চ। উল্লেখ্য, ২০০৮ সালে এই সূচক তৈরি শুরু হয়। তারপর থেকে প্রথমবারের মতো এবার এতে নেই আফগানিস্তান। যদিও সেখানে নিরাপত্তা পরিস্থিতি ঘোলাটে, কোনো সাংবাদিক হত্যায় শাস্তি দেয়া হয়নি। তবু সেখানে টার্গেট করে সাংবাদিক হত্যা কমে এসেছে। এর পরিবর্তে সেখানে বড় ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চলছে। মে মাসে কাবুলে ট্রাকবোমা হামলা হয়েছে। তাতে ১৫০ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছেন একজন সাংবাদিক। গত এক দশকে যুদ্ধের রিপোর্ট করতে গিয়ে, ক্রসফায়ারে অথবা বিপজ্জনক অ্যাসাইনমেন্ট কভার করতে যাওয়া এক ডজনেরও বেশি সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে আফগানিস্তানে। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অপরাধের দায়মুক্তি বন্ধের দাবিতে আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে ২রা নভেম্বর এ তালিকা প্রকাশ করে সিপিজে। এতে গত একদশকে কোন কোন দেশে সাংবাদিক হত্যার বিচার হয়নি, তা তুলে ধরা হয়। এতে ২০০৭ সালের ১লা সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৭ সালের ৩১শে আগস্ট পর্যন্ত সময়ের মধ্যে গড়ে প্রতিটি দেশে কতজন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন, তা বিচার-বিশ্লেষণ করা হয়। যেসব দেশে কমপক্ষে ৫টি বা তারও বেশি সাংবাদিক হত্যার বিচার হয়নি সেই দেশগুলোকেই এই তালিকায় স্থান দেয়া হয়। এ বছর এ তালিকায় এমন দেশ রয়েছে ১২টি। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ১৩। সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি থেকে ক্রম অনুযায়ী দেশগুলো হলো- সোমালিয়া, সিরিয়া, ইরাক, দক্ষিণ সুদান, ফিলিপাইন, মেক্সিকো, পাকিস্তান, ব্রাজিল, রাশিয়া, বাংলাদেশ, নাইজেরিয়া, ভারত। এতে বলা হয়েছে, সাংবাদিক হত্যায় দায়মুক্তির একমাত্র কারণ সংঘাতময় পরিস্থিতি নয়। ফিলিপাইন, মেক্সিকো, ব্রাজিল, রাশিয়া ও ভারতের মতো দেশ নিজেদেরকে গণতান্ত্রিক বলে দাবি করে, কিন্তু বারবার এসব দেশ এই তালিকায় উঠে আসছে। এসব দেশে সাংবাদিক হত্যাকারী সরকারি কর্মকর্তা বা ক্রিমিনাল গ্রুপগুলো রয়ে যাচ্ছে শাস্তির বাইরে। উচ্চ হারে এ ঘটনা ঘটছে। সোমালিয়ায় দায়মুক্তি বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে শতকরা ১৯৮ ভাগ। মেক্সিকোতে শতকরা ১৪২ ভাগ। পাকিস্তানে ১১২ ভাগ। ভারতে ১০০ ভাগ। সিরিয়ায় ১৯৫ ভাগ। ব্রাজিলে ১৭৭ ভাগ। ২০০৮ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে এই সূচকে মাঝে মাঝে বাদ পড়েছে আফগানিস্তানসহ অন্য চারটি দেশ। এগুলো কলম্বিয়া, সিয়েরালিয়ন, শ্রীলঙ্কা ও নেপাল। শুধু কলম্বিয়া ও নেপালে সাংবাদিক হত্যাকারীদের শাস্তি দেয়া হয়েছে। তা-ও হাতেগোনা মামলায়। এতে বলা হয়েছে, গত একদশকে বাংলাদেশে সাতজন সাংবাদিক হত্যায় পূর্ণাঙ্গ দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে। এসব হত্যায় জড়িত সন্ত্রাসী ও অপরাধী গ্রুপগুলো। টার্গেট করা হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষ ব্লগার, মাদকের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করা সাংবাদিকদের। গত বছর নভেম্বরে পুলিশ আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের এক সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। ধর্মনিরপেক্ষ ব্লগার নিলয় নীল ও ফয়সাল আরেফিন দীপন হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে সে। সম্পাদক ও ধর্মনিরপেক্ষ ব্লগারদের বিরুদ্ধে এমন হত্যাকাণ্ড ও তাদের ওপর নৃশংস আক্রমণের ঘটনায় ২০১৫ সাল থেকে বেশ কিছু সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়েছে। তবে শুধু একটি মামলায়, খুনিদের অভিযুক্ত করে শাস্তি ঘোষণা করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন