ময়মনসিংহে স্কুল-কলেজ বাদ দিয়ে কোচিং বাণিজ্য

0
3260

বাবলী আকন্দ: বিভাগীয় শহর ময়মনসিংহ হওয়ার আগে থেকেই ময়মনসিংহ শহরকে শিক্ষা নগরী হিসেবে বলা হয়ে থাকে । শহরের আনাচে কানাচে স্কুল যে হারে বাড়ছে , ঠিক তার সাথেই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিভিন্ন নামে এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্যারের নাম দিয়েও প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে কোচিং সেন্টারগুলো। বাহারী নাম আর রঙ্গিন ব্যানারে ছেয়ে যাচ্ছে শহর। নামের সাথে বিভিন্ন পদবী লাগাতেও কেউ পিছপা হচ্ছেন না। ফলে বিভ্রান্ত হচ্ছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকগণ। বিভ্রান্তেই থেমে থাকেনি , চলছে ভয়ের খেলা। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকগণ নিজেদের প্রতিষ্ঠিত কোচিং সেন্টারগুলোতে কাস না করলে বোর্ড মার্ক না দেয়া অথবা ফেল করিয়ে দেয়ার ভয়ও দেখাচ্ছেন। নিজেদের নাম দিয়ে যেখানে সেখানে এমনকি রাস্তার পাশে স্টেশনারী দোকানকে ভাড়া করে বসে যাচ্ছেন শিক্ষা ব্যবসায়। যেখানে নাই পড়ার পরিবেশ , চলছে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আড্ডা। ভিন্ন ভিন্ন প্রাইভেট এ শিক্ষার্থীদের পড়াশুনার খোঁজ নিতে গিয়ে দেখা দেয় ভয়ংকর সব পরিবেশ, দোকানঘর ভাড়া নিয়ে সার্টার লাগিয়ে তা পড়ানোর রুম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
নিজ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের আনার জন্য অভিনব কৌশল আবিষ্কার করছেন তারা। শিক্ষার্থীদের নিজ প্রতিষ্ঠানে নেয়ার জন্য আগ্রহ তৈরী করাচ্ছেন বিভিন্ন টিপস্ দিয়ে। কিছু শিক্ষক এর মাঝে টাকা দিয়ে, ট্যুর করিয়ে, দামী রেস্টুরেন্টে নিয়ে খাওয়াচ্ছেন। আগ্রহ তৈরী হলেই ব্যস। অতিরিক্ত টাকা দিয়ে ভর্তি নিচ্ছেন কোচিং সেন্টারে। বিশেষ করে শহরের নাহার রোড, বাউন্ডারী রোড , জমির মুন্সী লেন রোড, জিলা স্কুল রোড, মোহাম্মদ আলী রোড, গুলকীবাড়ী, সেনবাড়ী, শ্যামাচরণ রায় রোড, রামবাবু রোড, কলেজ রোড সহ বেশকিছু এলাকার সর্বত্রই বিভিন্ন ব্যানার ফেস্টুনে প্রচারের মাধ্যমে কলেজের শিক্ষকরা নিজেদের বাসা ভাড়া নিয়ে বা আলাদা রুম ভাড়া করে প্রকাশ্যেই প্রাইভেট বাণিজ্য করে যাচ্ছেন। এলাকাগুলো দিনের প্রায় ১৬ ঘন্টাই কোমলমতি ছেলেমেয়েদের দ¦ারা মুখরিত থাকে আর এর মূল কারণ শিক্ষার্থীরা কলেজ বাদ দিয়ে প্রাইভেট পড়তে যাচ্ছে। শহরের অলিগলিতে এমনি নামের ব্যবহার .. সাজ্জাত স্যারের বিজ্ঞান একাডেমী, রকি স্যারের ইংলিশ প্রাইভেট প্রোগ্রাম, ফেরদৌস ইংলিশ ক্যাডেট হোম, সমাধান কোচিং সেন্টার, সৃজনশীল গণিত একাডেমী, মেধাসিঁড়ি। তেমনি নবম-দশম শিক্ষাথীদের রসায়ন, পদার্থ এবং একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণীর শিক্ষাথীদের পদার্থের কোচিং করান মোঃ সাজ্জাতুল ইসলাম যিনি বি.এস.সি. অনার্স, এম.এস.সি. (পদার্থ), পদার্থবিজ্ঞানের প্রভাষক কিন্তু কোন কলেজ তা উল্লেখ নেই। সেই সাথে তিনি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ঢাকা’র পরীক্ষক।
২০১৩-২০১৪ সালেও এমনই এক নারী কেলেঙ্কারীর অভিযোগের দরুণ ময়মনসিংহ থেকে বদলী হয়ে যান রসায়ন বিভাগের শিক্ষক তারিক সালাহউদ্দিন মামুন। যিনি অনেক চেষ্টার পর বর্তমানে আবারও ময়মনসিংহের সবথেকে বড় বিদ্যাপীঠ সরকারী আনন্দমোহন কলেজে রসায়ন বিভাগে কর্মরত থেকে মুসলিম ইন্সটিটিউট এর ২য় তলায় সর্বশেষের রুমটিতে সকাল থেকে রাত অবদি পড়িয়ে যাচ্ছেন।
নিজেদের বড় মাপের শিক্ষক প্রমাণ করতে অনেক শিক্ষক নিজেদের ঢালাওভাবে প্রাইভেট পড়ার জন্য শিক্ষার্থীদের কলেজের কাসেই উৎসাহ প্রদান করেন যাদের মধ্যে একজন মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজের গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক দেবতোষ কুমার নিয়োগী। তাঁর বিরুদ্ধে অনেক শিক্ষার্থীরই অভিযোগ অনেকটাই এরকম , তিনি অত্র কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের কাস গুলোতে গিয়ে তাঁর কলেজ রোডস্থ ৩৩/সি বাসার ঠিকানা বলে দিয়ে আসেন, বিগত বছরের অনেকের কাছ থেকে এও শোনা যায়, তার কাছে না পড়লে কলেজ পরীক্ষায় অনেককেই নম্বরতো কম দিয়েছেই এমনকি ফেল পর্যন্ত করিয়েছে। আবার কলেজের পার্শ্ববর্তী মোহাম্মদ আলী রোডে র২ঁ নামক ভবনের ২য় তলায় মোঃ আলমগীর হোসেন নামের উদ্ভিদবিজ্ঞানের প্রভাষকের ঠিকানাও প্রচার দিয়ে আসেন এই সহযোগী অধ্যাপক।

আবার একই কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ইশতেয়াক আহমদ তার মোহাম্মদ আলী রোডের নিজ বাসভবনে গত কয়েক বছর ধরেই প্রাইভেট পড়িয়ে যাচ্ছেন।
অন্যদিকে সরকারী আনন্দমোহন কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক বাবুল চন্দ্র রায় গুলকীবাড়ীতে , বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এ.কে.এম. মাকসুদুল আলম বাউন্ডারী রোডের নিজ বাসায় পড়িয়ে থাকেন।
শহরের অত্র দুটি ছাড়াও প্রায় সকল কলেজের কিছু কিছু শিক্ষকদের বিরুদ্ধেই প্রাইভেট নিয়ে হাজারো অভিযোগ আর উৎকন্ঠা।
জমীর মুন্সি লেন গিয়ে দেখা যায়, ময়মনসিংহ কমার্স কলেজের শিক্ষক এ.কে.আজাদ রুমের ভিতর শিক্ষার্থীদের পড়াচ্ছেন আর বাহিরের বিলবোর্ডটিও চোখে পড়ার মত যেখানে লিখা পরীক্ষক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ঢাকা।
বাউন্ডারী রোডে রয়েছেন … ঘঞজঈঅ কর্তৃক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হিসাববিজ্ঞানের শিক্ষক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম, ঐঝঞঞও কর্তৃক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনাব মোশাররফ হোসেনের ইংলিশ প্রাইভেট কেয়ার, মহিলা ডিগ্রী কলেজের শান্ত স্যারের বিজ্ঞান একাডেমী, মাস্টার ট্রেইনার শহীদুল ইসলাম সবুজ স্যারের এস.এম. ইংলিশ একাডেমী, ময়মনসিংহ নটরডেম কলেজের গণিত বিভাগের শিক্ষক নন্দন সরকার’এর ম্যাথ প্রাইভেট টিউটোরিয়াল, ময়মনসিংহ কমার্স কলেজের ইংলিশ বিভাগের শিক্ষক অরূপ স্যার’এর অরূপ মেথড অব লার্নিং ইংলিশ।
জিলা স্কুল রোডে রয়েছে … পরীক্ষক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ঢাকা’র অঘোর মন্ডল শুভ্র এর বর্ণমালা বাংলা শিক্ষণ কেন্দ্র, ধোবাওড়া আদর্শ কলেজের গণিতের প্রভাষক মোঃ ইকবাল হোসেনের বেসিক বিজ্ঞান ও গণিত, পরীক্ষক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ঢাকা এবং মহাকালী গার্লস স্কুল এন্ড কলেজের বাংলার প্রভাষক মোঃ খলিলুর রহমানের ছন্দ বাংলা, কেশরগঞ্জ পলাশহাটা স্কুল এন্ড কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক মোঃ আশরাফুল আলম পড়াচ্ছেন ইংরেজি এবং হিসাববিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মোঃ নাজমুল ইসলাম পড়াচ্ছেন হিসাববিজ্ঞান, রয়েল মিডিয়া কলেজের গণিত বিভাগের প্রভাষক পল্লব কুমার সরকার এর ‘গোল্ডেন+’ একাডেমী, মহাকালী গার্লস স্কুল এন্ড কলেজের বাংলার অপর প্রভাষক এনামুল হক ইমন নিজেও এই রোডেই পড়াচ্ছেন,
এছাড়াও বিদ্যাময়ী স্কুলের বিপরীতে ইনডিকেটর কোচিং সেন্টারে এডভান্সড রেসিডেন্সিয়াল কলেজের বাংলার প্রভাষক পরিচালনা করছেন ‘কবির সৃজনশীল একাডেমী’ , ১৭ সাহেব আলী রোডে ফুলবাড়ীয়া রয়েল কলেজের গণিতের প্রভাষক ফিরোজ জাহান এর এক্সকুসিভ গণিত প্রোগ্রাম এছাড়াও এই ছোট গলিতে আছে শত শত নাম না জানা স্কুল-কলেজের শিক্ষকের ব্যানার, যেখানে মুদি দোকান বন্ধ করে, ট্রেইলার্স বন্ধ করে এমনকি হোটেল বন্ধ করেও সেসব রুমে সার্টার ব্যবহার করে আবার মাল্টিন্যাশনাল অফিসের মত করে কর্পোরেট অফিস বানিয়ে দিব্যি প্রাইভেট কার্যক্রম চালাচ্ছে শিক্ষকরা।
অবাক করার মত বিষয় যে, অনেক শিক্ষকের স্কুল বা কলেজ (কর্মস্থল) শহরের বাইরে ভিন্ন থানায় অনেকের ভিন্ন জেলাতেও তাহলে তারা কলেজের কাস গ্রহণের পর বাসার পড়ানোর জন্য সময় বের করেন কিভাবে নাকি কলেজেই যান না, সেটা নামমাত্র ব্যানার কেবল।
প্রাইভেট বিষয়ে কিছু শিক্ষকদের সাথে কথা বলতে গেলেই উনারা অনেকেই বলে বসেন যেখানে শহরে অবস্থানরত বিভিন্ন কলেজের অধ্যক্ষ’রাই নিজ বাসায় প্রাইভেট পড়ান সেখানে আমাদের পড়াতে কি সমস্যা ?
এমতাবস্থায় খোঁজ নিয়ে দেখা শহীদ আলমগীর মনসুর মিন্টুর নামে প্রতিষ্ঠিত শহরের প্রাচীন ও নামকরা একটি কলেজ আলমগীর মনসুর (মিন্টু) মেমোরিয়াল কলেজের অধ্যক্ষ জনাব নীহার রঞ্জন রায় শহরের পন্ডিতবাড়ীস্থ নিজ বাসায় অনেকদিন যাবৎ-ই পড়িয়ে যাচ্ছেন।
নবম-দশম বা একাদশ-দ্বাদশ কিংবা কাস সিক্স এর শিক্ষার্থীই হোক স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা তাঁদের বাধ্য করে প্রাইভেট পড়তে।
সরজমিনে গিয়ে নব্য এসএসসি পাশ করা কিছু শিক্ষার্থীর সাথে কথা বলে জানা গেছে বিভিন্ন কলেজের শিক্ষকরা তাদের কলেজে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই অনেক অভিভাবকদেরকে পর্যন্ত ব্যবহারিক নম্বরের ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের বাসায় বা প্রতিষ্ঠানে পড়তে জোর করে বাধ্য করাচ্ছে।
( চলবে . . . . . )

মন্তব্য করুন