ময়মনসিংহে ব্রিফকেছে খন্ডিত লাশ ক্রাইম প্রেট্টোল ও সিআইডিকেও হার মানিয়েছে

0
2560
  1. গ্রেফতারকৃত ৪ জনের আদালতে স্বিকারোক্তি- এসপি শাহ আবিদ হোসেন

স্টাফ রিপোটার:  মোঃ বকুল (২৮)। নেত্রকোণার পূর্বধলার হুগলা গ্রামের ময়েজ উদ্দিনের ছেলে। পাশ্ববর্তী সাবিনা আক্তার (১৮)কে ভালবেসে প্রেম নিবেদন করে। প্রেম প্রস্তাব প্রত্যাখানে ব্যর্থ। সৃষ্টি করে ভুয়া এফিডেফিট। ঐ এফিডেভিটে বকুলের সাথে সাবিনার বিয়ে হয়েছে দাবী করা হয়। এ নিয়ে গ্রাম্য শালিশ হয়। প্রমানিত হয় এফিডেভিটটি ভুয়া।

পরবর্তীতে সাবিনা আক্তারের বিয়ে হয় পার্শ্ববর্তী এলাকায়। এর পরও থামেনি বকুল। স্বামীর বাড়িতে থাকা সাবিনাকে নানাভাবে করতে থাকে উত্যক্ত। অতিষ্ট হয়ে পড়ে সাবিনা। সিদ্ধান্ত নেয় প্রেমের ফাঁদে ফেলে বকুলকে খুন করবে। যা সিদ্ধান্ত তাই করে। সাবিনা তার দুই ভাই ও ভাবীর সহায়তায় বকুলকে বালিশ ও রশি দিয়ে গলায় ফাস দিয়ে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করে। পরে হত্যার আলামত ও লাশের পরিচয় গোপন করার পরিকল্পনা হিসাবে লাশের শরীর থেকে মাথা, হাত ও পা বিচ্ছিন্ন করে ছয়টি টুকরো। টুকরোগুলো পলিথিন দিয়ে শক্ত করে মুড়িয়ে ট্রলি ব্যাগে (ব্রিফকেছ) ভড়ে। পরে শরীর ভর্তি ট্রলি ময়মনসিংহের পাটগুদাম ব্রীজ মোড়ে এবং কুড়িগ্রাম জেলা সদর ও রাজাপুরে পৃথকভাবে হাত, পা ও মাথা নিশ্চিন্তে চলে যায় খুনী চক্র। ময়মনসিংহের পাটগুদাম ব্রীজ মোড় থেকে হাত, পা ও মাথা বিহীন বিহীন শরীর উদ্ধারের ঘটনায় কোতোয়ালী মডেল থানায় মামলা নং ১০২, তাং ২৫/১০/১৯ দায়ের হয়। ব্রিফকেছ ভর্তি মাথা, হাত ও পা বিহীন শরীর উদ্ধারের ঘটনার নয়দিনের মাথায় ময়মনসিংহ ডিবি পুলিশ নিহত মোঃ বকুলকে সনাক্তকরণসহ খুনের সাথে জড়িত থাকা চার খুনীকে গ্রেফতার করে। বুধবার (৩০) অক্টোবর পুলিশ লাইন্স হলরুমে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে ময়মনসিংহের পুলিশ সুপার (অতিরিক্ত ডিআইজি হিসাবে সদ্য পদোন্নতি প্রাপ্ত) শাহ আবিদ হোসেন এ তথ্য জানান।

প্রেস ব্রিফিংয়ে পুলিশ সুপার বলেন, গত ২০ অক্টোবর সন্ধ্যায় ময়মনসিংহের পাটগুদাম ব্রীজ মোড়ে একটি ব্রিফকেছ পড়ে থাকার খবর পেয়ে ডিবি, কোতোয়ালীসহ পুলিশের ডিআইজি নিবাস চন্দ্র মাঝিকে সাথে নিয়ে তিনি ঘটনাস্থলে যান। ব্রিফকেছটি অনেক ওজন এবং জঙ্গি গোষ্টির মাধ্যমে শক্তিশালী বোমা ফেলে রাখার মত সন্দেহ পোষণ করে পুলিশের উচ্চ পদস্থদের সাথে পরামর্শ করেন। এক পর্যায়ে পরদিন সকালে ডিএমপির বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দলের সহায়তায় ব্রিফকেছটি খুলে দেখতে পান হাত, পা ও মাথা বিহীন শরীর (বডি) পলিথিন দিয়ে মোড়ানো। ব্রিফকেস ভর্তি খন্ডিত শরীর পাওয়ার ঘটনায় কোতোয়ালী পুলিশের পাশাপাশি ডিবি পুলিশকে ছায়া তদন্ত করতে তাৎনিক নির্দেশ দেন। ডিবি পুলিশ ছায়া তদন্তের নির্দেশ পেয়ে পাটগুদামসহ আশপাশ এলাকার সিসি টিভির ফুটেজ সংগ্রহ করেন। এদিকে পনদিনই ২২ অক্টোবর কুড়িগ্রাম সদর ও রাজাপুর এলাকা থেকে খন্ডিত পা এবং অপর পা, হাত ও মাথা উদ্ধার করে পুলিশ। এ সময় কুড়িগ্রাম পুলিশ একটি চিরকুট উদ্ধার করে। পরে ২৫ অক্টোবর কোতোয়ালী মডেল থানায় মামলা নং ১০২, তাং ২৫/১০/১৯ দায়ের হয়। যা পরে ডিবি পুলিশের উপর তদন্তভার দেয়া হয়।

পুলিশ সুপার বলেন, কুড়িগ্রাম থেকে উদ্ধার হওয়া চিরকুট এবং ডিবি পুলিশের উদ্ধার করা সিসি টিভির ফুটেজ পর্যালোচনা করে ময়মনসিংহের ডিবি পুলিশ নিহত ব্যক্তির পরিচয় সনাক্ত করেন। এবং চারজনকে গ্রেফতার করেন। গ্রেফতারকৃতরা হলো ফারুক মিয়া, হৃদয় মিয়া, সাবিনা আক্তার ও ভাবী মৌসুমী আক্তার। গ্রেফতারকৃত চারজনই আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে হত্যাকান্ডের দায় স্কিকার করেন বলে পুলিশ সুপার জানান।

ডিবি পুলিশের ওসি শাহ কামাল আকন্দ বলেন, পাটগুদাম ব্রীজ থেকে খন্ডিত শরীর পাওয়ার পরই পুলিশ সুপারের নির্দেশে ছায়া তদন্ত শুরু করি। পরদিনই কুড়িগ্রমা থেকে চিরকুট পাওয়ার খবরে কুড়িগ্রাম পুলিশের কাছ থেকে চিরকুটের তথ্য সংগ্রহ করি। সিসি টিভির ফুটেজ ও চিরকুটের বিভিন্ন তথ্য পর্যালোচনা করে পুলিশ সুপার শাহ আবিদ হোসেনের সাথে পরামর্শ এবং দিক নির্দেশনায় তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই আক্রাম হোসেনসহ অন্যান্যদের নিয়ে ময়মনসিংহের তারাকান্দায় অভিযান পরিচালনা করি।

তারাকান্দা থেকে তামিম নামে একজনকে আটক করে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে পুলিশ কাঙ্খিত লক্ষে পৌছি। পরবর্তীতের তামিমের দেয়া তথ্য মতে, নিহত ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত হই। এ সময় তামিম হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত চারজনের নাম প্রকাশ করে। ঐ সুত্র ধরে পুলিশ সুপারের নির্দেশণায় এবং ওসি ডিবি শাহ কামাল আকন্দের পরিকল্পনায় তদন্তকারী কর্মকর্তা সোমবার গাজীপুরের বানিয়ার চালা থেকে ফারুক মিয়া ও তার স্ত্রী মৌসুমী আক্তারকে একটি বাসা থেকে গ্রেফতার করে। পরবর্তীতে তাদেরকে নিয়ে মেম্বার বাড়ি এলাকায় ঘুরাঘুরিকরাকালে ফারুক মিয়া অপর ভাই হৃদয় মিয়া ও তার বোন সাবিনা আক্তারকে গ্রেফতার করা হয়।

গ্রেফতারকৃত ৪ আসামী ছবি

ডিবির ওসি আরো জানান, গ্রেফতারকৃতরা পুলিশ ও আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে হত্যার দায় ও হত্যাকান্ডের বর্ণনা এবং লাশের পরিচয় গোপন করার নানা পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করে। গ্রেফতারকৃত সাবিনা আক্তারের বরাত দিয়ে ডিবির ওসি আরো বলেন, নিহত বকুল এবং তাদের বাড়ি একই এলাকায় হওয়ায় সে মাঝে মধ্যেই প্রেম নিবেদনসহ নানাভাবে উত্যক্ত করে আসছিল। প্রেম প্রস্তাব প্রত্যাখান করায়, বকুল তার (সাবিনা আক্তার) সাথে বিয়ের নাটক সাজাতে একটি ভুয়া এফিডেভিট তৈরী করে। এ নিয়ে গ্রাম্য শালিশে মিমাংসা হয়। পরবর্তীতে কাছাকাছি এলাকায় সিদ্দিক নামে এক ব্যক্তির সাথে সাবিনা আক্তারের বিয়ে হয়। সাবিনা তার স্বামীর বাড়িতে থাকাকালে বকুল তার সাথে এতকরফা সম্পর্ক এমনকি নানা অনৈতিক সম্পর্কের চেষ্ঠা করে। এতে সাবিনা আক্তারের বৈবাহিক জীবন বিষিয়ে উঠে। এক পর্যায়ে সাবিনা সিদ্ধান্ত নেয় তাকে খুন করা ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই। সাবিনা প্রেমের নাটক শুরু করে বকুলের সাথে। সাবিনার জন্য বেকুল হয়ে থাকা বকুল তার প্রেমের প্রস্তাবে সাড়া দেয়। এক পর্যায়ে সাবিনা তার স্বামীর বাড়ি থেকেই বকুলকে নিয়ে পালিয়ে যায়। গাজীপুরে থাকা বকুলের বোনের বাসায় উঠে। টানা সাতদিন ঐ বাসায় থাকার পর সাবিনা তার কথিত প্রেমিক বকুলকে নিয়ে গত ১৯ অক্টোবর গাজীপুরের বাঘেরবাজার বানিয়ার চালা এলাকায় থাকা তার (সাবিনার) ভাই ফারুক মিয়া ও ভাবী মৌসুমীর বাসার উঠেন। সাবিনার বরাত দিয়ে ওসি শাহ কামাল আকন্দ আরো বলেন, ঐ রাতেই সাবিনার ভাই ফারুক মিয়া, হৃদয় মিয়া ও ভাবী মৌসুমী আক্তারের সহায়তায় বালিশ চাপা ও গলায় রশি পেচিয়ে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করে। পরে চাকু দিয়ে শরীর থেকে মাথা, হাত, পা বিচ্ছিন্ন করে। পরবর্তীতে লাশের পৃথক খন্ডিত অংশগুলো পলিথিন দিয়ে মুড়িয়ে প্যাকেট করে। ঐ প্যাকেটগুলো পৃথক দুটো নতুন ব্রিফকেছে ভর্তি করে। খন্ডিত শরীর ভর্তি ব্রিফকেছটি সাবিনার ভাই ফারুক মিয়া ও হৃদয় মিয়া একটি বাসযোগে বহন করে পুর্বধলার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। পথিমধ্যে ময়মনসিংহ পাটগুদাম ব্রীজ এলাকায় কৌশলে ফেলে পালিয়ে যায়। অপরদিকে সাবিনার ভাবীর বাড়ি কুড়িগ্রামের কৃষ্ণপুর মিয়াপাড়া হওয়ায় কুড়িগ্রামের উদ্দেশ্যে ভাবীকে নিয়ে সে রওনা দেয়। এ সময় খন্ডিত হাত, পা ও মাথা ব্রিফকেছে ভড়া সম্ভব না হওয়ায় খন্ডিত মাথা ভাবী মৌসুমী তার ব্যানিডি ব্যাগে ভড়ে এবং অপর খন্ডিত অংশগুলো ব্রিফকেছ নিয়ে কুড়িগ্রামের উদ্দেশ্যে যায়। এ সময় কুড়িগ্রাম সদরে একটি পা এবং রাজাপুরে খন্ডিত অপর হাত পা ও মাথা ফেলে পালিযে যায় সুচতুর ভয়ংক খুনীচক্র। একই পরিবারের তিন ভাই বোন ও ভাবীসহ চারজনকে গ্রেফতার পরবর্তী পুলিশী জিজ্ঞাসাবাদে এ সব তথ্য প্রকাশ করে খুনীচক্র। ওসি আরো বলেন, পরবর্তীতে খুনীদের তথ্য ও দেখানো মতে,

নেত্রকোণার পুর্বধলার সুতারপাড়া থেকে হত্যা পরবর্তী লাশ খন্ডিত কাজে ব্যবহৃত একটি ছুরি, নিহতের মোবাইল ফোন, কুড়িগ্রামে লাশের খন্ডিত অংশ বহনে ব্যবহৃত ট্রলি ব্যাগ ও হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত একটি ইটের অংশ উদ্ধার করা হয়।

এর আগে ব্রিফিংয়ে পুলিশ সুপা শাহ আবিদ হোসেন আরো বলেন, ডিবি পুলিশ নেত্রকোণার পুর্বধলা, গাজীপুরের মাওনা, ময়মনসিংহ ও কুড়িগ্রামে অভিযান পরিচালনা করে যে দতা, অভিজ্ঞতা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছে তার আমার জীবনের সেরা উদ্ধার কার্যক্রম। যা টেলিভিশনের প্রচারিত ক্রামই প্রেট্টোল ও সিআইডিকেও হার মানিয়েছে। শুধু তাই নয় এটি একটি অসাধারণ উদ্ধার।

মামলার তদনতাকারী কর্মকর্তা এসআই আক্রাম হোসেন বলেন, খুনীচক্র খুনের আলামত নষ্ট ও লাশ গোপন করতে পৃথক তিনটি এলাকায় ফালানো হয়েছে। তাদের বিশ্বাস ছিল তিন জায়গায় ফালানো হলে আইন শৃংখলা বাহিনী এর রহস্য উদঘাটন করতে পারবে না। তিনি আরো বলেন, কৌশলী পুলিশ সুপার এবং দ, দায়িত্বশীল ও অভিজ্ঞ ডিবির ওসির নেতৃত্বে তদন্তকারী টিস মাত্র ২৪ ঘন্টার মধ্যে রহস্য উদঘাটন সম্ভব হয়েছে। পরবর্তীতে খুনী চক্রকে গ্রেফতারে অনেকটা সময় বিলম্বিত হয়েছে। তিনি আরো বলেন, এটি একটি অসাধারণ মামলা এবং খুনের ঘটনা। এ মামলার তদন্ত, রহস্য উদঘাটন এবং খুনীদের গ্রেফতার করার ঘটনা ভবিষ্যতে মামলা তদন্ত এবং আরো বড় ধরণের ঘটনার রহস্য উদঘাটনে সহজতর হবে। এ হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটনে ডিবির তথ্য প্রযুক্তি বিভাগের এসআই পরিমল চন্দ্র সরকার, এএসআই তপু আহমেদ, জুয়েল মিয়া, কন্সটেবল রুহুল আমিন সহযোগিতা করেছেন।

প্রেস ব্রিফিংয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হুমায়ুন কবির, এস এ নেওয়াজী, আল আমিন, কোতোয়ালী মডেল থানার ওসি মাহমুদুল ইসলাম, ডিবির ওসি শাহ কামাল আকন্দ, পুলিশ পরিদর্শক ই্উনুছ আলী, ফারুক আহমেদ, আরও মনিরুজামান, এসআই আক্রাম হোসেনসহ অন্যান্যরা উপস্থিত ছিলেন।

মন্তব্য করুন