বাংলাদেশে ক্রসফায়ারে’ ৯ মাসে নিহত হয়েছেন ১০৭ জন : পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু ৩৩

0
1336

রাজধানীসহ সারাদেশে বেড়েই চলছে খুন, গুম আর ক্রসফায়ারের ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা। আর এই পরিস্থিতিতে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি দেশের মানবাধিকার সংগঠনের কর্মকর্তারাও উদ্বিগ্ন। চলছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কথিত ক্রসফায়ার এবং বন্দুকযুদ্ধেই নিহতদের লাশ পড়ে থাকে যেখানে সেখানে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় খালে, বিলে, জলাশয়ে, নদীতে এমনকি বনে-জঙ্গলে পাওয়া যাচ্ছে গুলিবিদ্ধ লাশ। আবার ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ক্ষেত্রে নিহত ব্যক্তির সহযোগী দাবি করে নামে-বেনামে আসামি করে হত্যামামলা করা হচ্ছে। নিহতের শরীরে মিলছে অসংখ্য গুলির ক্ষত। : এদিকে গতকাল সোমবার বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার পক্ষ থেকে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তথাকথিত ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে ১০৭ জন। আর এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দেশের অন্যতম মানবাধিকার সংগঠন। তাদের প্রকাশিত তথ্যমতে, গত ৯ মাসে র‌্যাবের হাতে ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে ১৮ জন, পুলিশের ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে ৮৭ জন এবং যৌথ বাহিনীর দ্বারা নিহত হয়েছে ২ জন। এছাড়া পুলিশ হেফাজত ও কারাবন্দি অবস্থায় বিভিন্ন কারণে মৃত্যু হয়েছে ৩৩ জনের। : এই মানবাধিকার সংস্থার চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সিগমা হুদা সাংবাদিকদের বলেন, ক্রসফায়ারে নিহতের ঘটনা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা গভীর উদ্বেগের বিষয়। ক্রসফায়ারে নিহতের ঘটনা জনমনে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। তিনি বলেন, একজন অপরাধীরও বিচার পাওয়ার অধিকার আছে। তার বিচারকার্য যেন দেশের আইন অনুযায়ী হয়। তিনি বলেন, ক্রসফায়ারে নিহতের ঘটনা দেশ ও আন্তর্জাতিক পরিসরে সমালোচিত একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ভাবমূর্তি উন্নয়ন ও মানবাধিকার রক্ষায় সরকারের উচিত এখনই এ বিষয়ে দ্রুত কোনো পদক্ষেপ নেয়া। : স্থানীয় সূত্রমতে, ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত ৩৩ জনের মধ্যে ১১ জন বিএনপি-ছাত্রদলের, ১০ জন জামায়াত-শিবিরের, ৫ জন সন্ত্রাসী-ডাকাত, একজন চরমপন্থী (যুবলীগের সাবেক কর্মী) এবং একজন ইয়াবা ব্যবসায়ী, গাড়িচালক, মোজাইক মিস্ত্রি, কারওয়ানবাজারের কাঁচামালের ব্যবসায়ী, টায়ারের দোকানের কর্মী ও মুঠোফোন মেরামত দোকানের কর্মী ছিলেন বলে তাদের পরিবারের দাবি। ‘বন্দুকযুদ্ধে’র এক থেকে দুই সপ্তাহ আগে তাদের ধরে নেয়া হয়েছিল বলে পরিবারগুলোর দাবি। আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, তার নাশকতাসহ নানা অপরাধে জড়িত। আগে গ্রেফতার হননি কিন্তু বন্দুকযুদ্ধের শিকার হয়েছেন এমন ঘটনাও আছে। : আবার নিহত অনেকের বেলায় ‘সড়ক দুর্ঘটনায়’ নিহত বলেও চালিয়ে দেয়া হচ্ছে। এমন ৪ জনের বিষয়ে স্বজনদের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ধরে নিয়ে তাদের হত্যা করেছে। এই চারজনের মধ্যে দুজন যশোরের মনিরামপুরে বিএনপির কর্মী, একজন চাঁপাইনবাবগঞ্জে ছাত্রশিবিরের কর্মী এবং একজন কুমিল্লার স্থানীয় সন্ত্রাসী। ৭ জনের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার হয়েছে, তাদের মধ্যে ৬ জনই বিএনপি-ছাত্রদলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। : অভিযোগ উঠেছে, আগে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পেশাদার অপরাধী নিহত হতো। সাম্প্রতিক সময়ে নিহত ব্যক্তিদের বেশিরভাগই রাজনৈতিক কর্মী। তবে এদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে আগে নাশকতার মামলা ছিল। ভয়াবহ নাশকতা দমন করতেই কঠোরতম সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। নিষ্ঠুরতার প্রতিকার নিষ্ঠুর প্রক্রিয়ায় হচ্ছে। : সাধারণ মানুষের মাঝেও নানা প্রশ্ন উঠেছে, গ্রেফতার, গুলি ও ক্রসফায়ারে রাজনীতিকদের টার্গেট করা হচ্ছে কেন। : বন্দুকযুদ্ধের নামে বিচার ছাড়া মানুষ মারা হচ্ছে কি না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে বরাবরই পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়ে থাকে, ‘আত্মরক্ষার অধিকার সবার আছে। পুলিশের ওপরে কেউ আক্রমণ করলে পুলিশ তার আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করবে। এ ক্ষেত্রে যদি কোনো ঘটনা ঘটে, সে ক্ষেত্রে প্রশাসনিক তদন্তের ব্যবস্থা আছে। পুলিশের জবাবদিহিতা সর্বত্র। আদালতের কাছে, জনগণের কাছে, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পুলিশকে জবাবদিহি করতে হয়।’ এসব ‘বন্দুকযুদ্ধ’ পরবর্তীকালে তাদের পেশাগত মূল্যায়নে ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হবে। প্রসঙ্গত, কর্মক্ষেত্রে বীরত্বপূর্ণ কাজ ও সাহসিকতার জন্য সর্বশেষ পুলিশ ও র‌্যাব কর্মকর্তাদের যে পুরস্কার দেয়া হয়েছে, তার মধ্যে ১৮ জনের কৃতিত্বপূর্ণ কাজের তালিকায় ছিল ‘বন্দুকযুদ্ধ’। : এছাড়া আইন ও সালিশ কেন্দ্রের বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা দমনের নামে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ১২৮ জন নিহত হয়েছে। : ‘বন্দুকযুদ্ধ’ নিয়ে পুলিশের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতে বলা হচ্ছে, সহযোগীদের গুলিতেই মৃত্যু হয়েছে। ৭ ফেব্রুয়ারি সকালে রাজধানীর শ্যামলীতে ট্রাফিক পুলিশের একজন সার্জেন্টের ওপর হামলার পর ঘটনায় শিবিরের ছয়জন কর্মীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ওই রাতেই পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন গ্রেফতার হওয়া মাদ্রাসাছাত্র জসীমউদ্দীন মুন্সী। : ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ‘সন্ত্রাসীদের’ গুলিতে নিহত হওয়ার প্রায় একই বর্ণনা দেয়া হয়েছে রাজধানীতে নিহত নড়াইলের জামায়াত নেতা ইমরুল কায়েস, ছাত্রদল নেতা খিলগাঁওয়ের নুরুজ্জামান জনি, কেরানীগঞ্জের মুঠোফোন দোকানের কর্মী রাসেল সরদার, মিরপুরের শ্রমিক দলের নেতা আবদুল ওদুদ ব্যাপারী নিহত হওয়ার প্রতিবেদনে। প্রতিটি ঘটনাতেই পুলিশ একটি করে হত্যা মামলা করেছে। : ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত ইমরুল কায়েসের সুরতহাল প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার শরীরে ১৯টি গুলির ক্ষতচিহ্ন পাওয়া যায়। খিলগাঁও থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান জনির শরীরে ১৬টি গুলির চিহ্ন ছিল। মিরপুরে ‘গণপিটুনিতে’ নিহত তিনজনের শরীরে ৫৪টি (যথাক্রমে ২২, ১৫ ও ১৭টি) গুলির চিহ্ন দেখা গেছে। নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও ঝিনাইদহেও এমন গুলিবিদ্ধ লাশ মিলেছে চারটি। পরে দেখা গেছে, এরা সবাই বিএনপি ও যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। : মানবাধিকার কর্মীরা বলেন, ‘এসব ঘটনা তখনই দেখা যাচ্ছে যখন দেশের সর্বোচ্চ ব্যক্তি থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্তাব্যক্তিরা এমন ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন, যা এ ধরনের ঘটনাকে উৎসাহিত করছে। এগুলো কোনো সুস্থ, স্বাভাবিক ঘটনা নয়। একটা গণতান্ত্রিক সমাজে এমন উদাহরণ মেলে না। এ বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্তের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

সুত্র: দিনকাল রিপোট

মন্তব্য করুন