প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় অগ্রগতি সত্ত্বেও চ্যালেঞ্জ রয়েছে অনেক

0
1209
প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় অগ্রগতি সত্ত্বেও চ্যালেঞ্জ রয়েছে অনেক

মোহাম্মাদ জমির : বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) প্রতিযোগিতা সক্ষমতা সূচক ২০১৭-১৮ অনুযায়ী, সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিবেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রের পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও প্রাথমিক শিক্ষায় বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য উন্নতি সাধনে সক্ষম হয়েছে। বিদ্যমান কিছু চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে আমাদের ক্রমাগত উন্নয়নের বিষয়টিকে তুলে ধরে।
বলা বাহুল্য, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে। বিশ্বের ১৩৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৯তম। আগের অবস্থানের তুলনায় প্রতিযোগিতা সক্ষমতা সূচকে সাত ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। এ তালিকায় আমরা পাকিস্তান থেকে এগিয়ে রয়েছি। তালিকায় তাদের অবস্থান ১১৫তম। যদিও ভারত ৪০তম, ভুটান ৮২তম, শ্রীলংকা ৮৫তম ও নেপাল ৮৮তম অবস্থান নিয়ে আমাদের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। উল্লেখ্য, বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম যা কিনা দাভোস ফোরাম হিসেবেও পরিচিত, ১৯৭৮ সাল থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশভেদে প্রতিষ্ঠান, অবকাঠামো, উৎপাদকের তুলনামূলক মান ইত্যাদির ওপর পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে এ তালিকা প্রকাশ করে আসছে। বিভিন্ন ধরনের গুণনীয়কগুলোকে তারা দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের পরিমাপক এবং একটি দেশের সম্ভাব্য উন্নয়নের মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন, সূচকে আগের তুলনার বাংলাদেশের অবস্থানের উন্নয়নের পেছনে প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রগতি ভূমিকা রেখেছে। প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে গত বছরের চেয়ে ২ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। তাছাড়া সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) অনুযায়ী, যে ১২টি স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে তালিকায় অবস্থান নির্ধারিত হয়, তার সবক’টিতেই বাংলাদেশ গতিশীলতা প্রদর্শন করেছে। তবে প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে আমরা অনেকটা পিছিয়ে রয়েছি। বিশ্লেষকদের মতে, তথ্যপ্রযুক্তি সক্ষম ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরিতে আমাদের অবস্থানটা এখনো ‘ভূমিষ্ঠ পর্যায়ে’। এটি হয়েছে প্রতিযোগিতার তীব্রতার অভাব, পেশাদার খুচরা সেবাসংক্রান্ত প্রতিযোগিতা হ্রাস ও দুর্বল নেটওয়ার্কিংয়ের কারণে। অর্থনীতিবিদরা মতামত দিয়েছেন, আমরা যদি এ দিকগুলো নিয়ে অগ্রসর হতে চাই, তাহলে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার জন্য আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বিশেষ করে ‘দ্য কম্পিটিশন অ্যাক্ট’-এর কার্যকর প্রয়োগ করতে হবে।
এ পর্যায়ে এটি উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক হবে যে, সূচকের ১১ ও ১২তম স্তম্ভে অগ্রগতির মাধ্যমে বাংলাদেশ বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা সূচকে সাত ধাপ এগিয়েছে। এর মধ্যে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা এবং ওয়ান স্টপ সার্ভিস শুরুর মতো পদক্ষেপ গ্রহণ আমাদের অবস্থানের উন্নতিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এ পদক্ষেপগুলো আমাদের বিদেশী বাণিজ্য ও সম্ভাব্য বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সরাসরি প্রভাব রাখতে সক্ষম, যা একই সঙ্গে আমাদের নগর ও গ্রামগুলোয় কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মেধাভিক্তিক প্রজন্ম গড়ার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
আরো উল্লেখ্য, র্যাপিড অ্যাসেসমেন্ট জরিপে ৫১ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, ২০১৬ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি ও নজরদারি ছিল দুর্বল। এছাড়া ২৯ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, পুঁজিবাজার এখনো অবৈধ কার্যকালাপ দ্বারা প্রভাবিত। ৪৫ শতাংশ ফাস্টট্র্যাক প্রজেক্টগুলোকে ঘিরে তাদের অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ এটাও দাবি করেছেন যে, অবাঞ্ছিতভাবে অবকাঠামো নির্মাণ খরচ বৃদ্ধি করা হয়েছে। ৫৮ শতাংশ উত্তরদাতা স্পেশাল ইকোনমিক জোন সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। বিশেষায়িত এ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আমরা বিনিয়োগকারীদের চাহিদা পূরণে কতটা সক্ষম হব, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে তাদের। বিশেষজ্ঞদের এ পর্যবেক্ষণগুলো সর্বোচ্চ গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করতে হবে। আমলাতান্ত্রিক মানসিকতার পাশাপাশি সিদ্ধান্ত নিতে ধীরগতি— আমরা এ বাস্তবতাগুলোকে উপেক্ষা করার উদাহরণ হতে পারি না। ঘুরে-ফিরে স্বচ্ছতার অভাব জবাবদিহিতার ক্ষেত্রগুলোকে প্রভাবিত করার মাধ্যমে আমাদের দুর্নীতির দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে।
এক্ষেত্রে দায়িত্বরত কর্তৃপক্ষকে আরো গুরুত্বসহকারে বিষয়গুলোর দিকে নজর দিতে হবে। প্রযুক্তি ও ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে আমাদের শিক্ষিত কর্মশক্তির গুণগত মান উন্নয়নের প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে। এটি তাদের কাজের পদ্ধতিগত পরিবর্তনের মাধ্যমে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। সমুদ্রবন্দরের অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিকগুলোয়ও গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে শিল্প ইউনিটগুলোয় ধারাবাহিক বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রশ্নে অবকাঠামোগত বাধা দুরীকরণে আমাদের আরো মনোযোগী হতে হবে। আমরা জানি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ের গুরুত্ব একাধিকবার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। এরই মধ্যে কিছু উন্নয়ন সাধিত হয়েছে, তবে এখানে আরো অনেক কিছু করার সুযোগ রয়েছে।
পরবর্তী প্রশ্নটি আর্থিক শাসন, সংখ্যা বৃদ্ধির চ্যালেঞ্জ এবং শ্রেণীবদ্ধ ঋণের পরিমাণ মোকাবেলাসংক্রান্ত। উল্লেখ্য, মন্দঋণ এ বছরের প্রথমার্ধে ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা থেকে ৫১ শতাংশ গ্রাস করেছে, যা সুদের হারকেও প্রভাবিত করে। ১ অক্টোবর ডেইলি স্টারে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর পরিচালনা মুনাফা ১১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১০ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকা হয়, কিন্তু নিট মুনাফা ৩৩ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা। পরিচালন মুনাফা থেকে নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) ও ট্যাক্স পরিশোধের পর যে অংশটুকু থাকে, তা ব্যাংকের নিট মুনাফা। বেশির ভাগ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো লোকসানে রয়েছে, তবে বেশকিছু বেসরকারি ব্যাংকের অবস্থাও আশঙ্কাজনক। যেমন— উদাহরণ হিসেবে ফারমার্স ব্যাংকের কথা বলা যেতে পারে, এটি ২৪ কোটি টাকার পরিচালন মুনাফার বিপরীতে ১৩ কোটি টাকা নিট ক্ষতির মুখে পড়েছে। এদিকে বিদেশী ব্যাংকগুলো ১ হাজার ২২৮ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা ও ৬২৫ কোটি টাকা নিট মুনাফা উঠিয়ে নিয়েছে।
তথাপি এটি উল্লেখ করা দরকার যে, চলতি বছরে সোনালী ব্যাংক বাদে বেশির ভাগ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সার্বিক মুনাফা পরিস্থিতিতে উন্নতি ঘটেছে। সোনালী ব্যাংকের মোট লোকসান যেখানে ১ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা, সেখানে অন্য পাঁচটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক মুনাফা করেছে ১০ থেকে ১২৭ কোটি টাকা। আরো বিস্ময়ের বিষয় হলো, গত বছরের মোট ৪৮ কোটি টাকা লোকসানের বিপরীতে বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত বেসিক ব্যাংক চলতি বছর মোট ১১ কোটি ৪০ লাখ টাকা মুনাফা করেছে। এসব ফ্যাক্টর এশীয় উন্নয়ন ব্যাংককে (এডিবি) আশান্বিত করেছে। সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে ব্যাংকটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৯ শতাংশের কাছাকাছি থাকবে। এসব প্রাক্কলন অবশ্য সরকারের ৭ দশমিক ৪ শতাংশ প্রাক্কলনের বিপরীত।
বিশ্বব্যাংক ও এডিবি উভয়ই আয় প্রবৃদ্ধিতে নিম্নমুখী মূল্যায়নের কিছু কারণ ব্যাখ্যা করেছে। তারা দেখিয়েছে, কৃষি ও মজুরিভিত্তিক কর্মসংস্থান উভয় খাতেই আয় প্রবৃদ্ধি কমবে। তারা এটিও বিবেচনায় নিয়েছে যে, বাইরে থেকে আসা প্রবাসী আয়ের পরিমাণ কমবে। এক্ষেত্রে সিরিয়া, ইরাক ও লিবিয়ায় চলমান সহিংসতা এবং সৌদি আরব ও অন্য তিনটি আরব দেশ কর্তৃক কাতারের ওপর আরোপিত অবরোধে সৃষ্ট অনিশ্চয়তার বিষয়গুলোও আমলে নেয়া হয়েছে। এটা বিদেশী শ্রমিক নিয়োগ হার কমিয়েছে।
এ দুই ব্যাংকের মূল্যায়ন আরো গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছে এজন্য যে, চলতি বছর ভয়াবহ মাত্রার বন্যার কারণে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রায় ৭ দশমিক ১ মিলিয়ন লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে অবকাঠামো, ঘরবাড়ি এবং সর্বোপরি কৃষি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এর সঙ্গে যোগ হয়েছে রোহিঙ্গা সংকট। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির কারণে অর্ধ মিলিয়নেরও বেশি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে প্রবেশে করেছে। তাদের শুধু স্বাস্থ্যসেবা ও আশ্রয় নয়, অসহায় মানুষ হিসেবে খাদ্য এবং অন্য সম্পর্কিত পৃষ্ঠপোষকতাও প্রয়োজন। কাজেই কোনো সুফল ছাড়াই আলোচ্য ইস্যুতে বা তাদের জন্য সরকারি কোষাগার থেকে প্রচুর অর্থ ব্যয় হবে।
অন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের জন্যও বিশ্বব্যাংকের ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদন আমাদের উদ্ধৃত করা দরকার। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সব শিল্প কর্মসংস্থানের ৪৫ শতাংশ এবং সেবাসংক্রান্ত কর্মসংস্থানের ৩৭ শতাংশ ঢাকা বিভাগে কেন্দ্রীভূত। ভূমিস্বল্পতার সঙ্গে মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যার আধিক্য এখানে শিল্প উৎপাদনে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। দ্বিতীয় যে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে, সেটি হলো ক্ষুদ্র উদ্যোগ। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে দেখা গেছে, দেশের অর্থনৈতিক ইউনিটের ৯৮ শতাংশই পরিবারকেন্দ্রিক (অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানগুলো পারিবারিকভাবে প্রতিষ্ঠিত, আবার প্রজন্মান্তরে পারিবারিকভাবেই সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করা হয়) এবং আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের অনুপস্থিতিতে দেশের অর্ধেক কর্মসংস্থানই অনানুষ্ঠানিক। সেখানে খোরাকির বিনিময়ে কাজ দেয়া হয়। এসব ফ্যাক্টরের উভয়ই তদারক করা এবং উৎপাদনশীলতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া দরকার। অধিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (এসএমই) বিপুল সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে। এক্ষেত্রে অবশ্যই ক্ষুদ্র উদ্যোগের সম্প্রসারণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী বিষয়গুলো রোধে নীতিনির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণমূলক উদ্যোগ নেয়া জরুরি।
অধিকন্তু উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থান বাড়াতে কঠোর সামষ্টিক কাঠামোগত নীতি সংস্কার, প্রাতিষ্ঠানিক ও বাজার সংস্কার এবং ব্যক্তি ও সরকারি বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। বিশ্ববাজারে বলিষ্ঠ উপস্থিতি এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখতে হলে বাংলাদেশকে অবশ্যই এটা করতে হবে। এটি আমাদের দারিদ্র্য প্রশমন এবং সম্মিলিত সমৃদ্ধি এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।
বণিক বার্তা থেকে নেয়া হেয়েছে।

লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত
সাবেক প্রধান তথ্য কমিশনার

মন্তব্য করুন