দেশে চলছে এখন জোড়ায় জোড়ায় খুন, নদী ডোবায় ঝোপ জঙ্গলে মিলছে লাশ

0
1368

আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতিতে আতঙ্কিত দেশের মানুষ। বিচারহীনতায় প্রতিদিনই অপরাধপ্রবণতা ক্রমশ বাড়ছে। ধর্ষণ, অপহরণ, চাঁদাবাজি, ডাকাতি, ছিনতাই, জবরদখল, নারী ও শিশু নির্যাতন তো বটেই নির্বিঘেœ খুনের ঘটনা ঘটছে অহরহ। গাছের সাথে বেঁধে প্রকাশ্যে পিটিয়ে, পুড়িয়ে ঘটছে পৈশাচিক হত্যাকান্ডও। নদী, ডোবা, ঝোপ-জঙ্গল, খোলা মাঠ থেকে একের পর এক লাশ উদ্ধার হচ্ছে। খুনের মাত্রা বেড়ে এখন চলছে জোড়ায় জোড়ায় খুন। এ যেন খুনের মহোৎসব চলছে দেশজুড়ে। পাশবিকতার হাত থেকে রেহাই মিলছে না ৪ বছরের শিশুরও। গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাও অব্যাহত রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক বলে দাবি করা হলেও সর্বত্র চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। বিশেষ করে গত কয়েক দিন আগে মাত্র ১২ ঘন্টার ব্যবধানে রাজধানীতে দুটি জোড়া খুনের ঘটনা চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। : গত ৩০

অক্টোবর ২০১৭, পুলিশ সদর দফতরে অনুষ্ঠিত ক্রাইম কনফারেন্সে উল্লেখ করা হয়, দেশে দস্যুতা, খুন, অপহরণ ও নারী নির্যাতন মামলার সংখ্যা বেড়েছে। দেশের মানবধিকার সংগঠনগুলোর মতে, প্রতিদিন গড়ে ১১ জন মানুষ হত্যার শিকার হচ্ছে। বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার (বিএমবিএস) তথ্যমতে, অক্টোবরে সারাদেশে শুধু সন্ত্রাসী কর্তৃক নিহত হন ৮৬ জন। পারিবারিক কলহে নিহত হন ৪২ জন, এদের মধ্যে পুরুষ ১২ জন, নারী ৩০ জন। স্বামীর হাতে নিহত হন ২৭ নারী। আর স্ত্রীর হাতে নিহত হন দুজন স্বামী। সামাজিক অসন্তোষের শিকার হয়ে গত মাসে নিহত হন ১১ জন, আহত হয়েছেন ২৯৭ জন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্রসফায়ারে নিহত হন ১৩ জন। এর মধ্যে পুলিশের ক্রসফায়ারে ৮ জন ও র‌্যাবের ক্রসফায়ারে ৫ জন নিহত হন। বিভিন্ন কারণে পুলিশ ও থানা হেফাজতে নিহত হন ৫ জন। অক্টোবর মাসে সারাদেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭৪ জন নারী ও শিশু। এদের মধ্যে ১৭ জন নারী গণধর্ষণের শিকার হন আর ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় দুজনকে। গত মাসে শিশু হত্যার হারও ছিল উদ্বেগজনক। ওই মাসে ৩০ শিশুকে হত্যা করা হয়। এদের মধ্যে মা-বাবার হাতে নিহত হন ৫ জন। সাভারে দেড় বছরের এক শিশুকে লাথি মেরে হত্যা করে পিতা। নরসিংদীতে ১৫ বছরের এক শিশুকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করে শিশুটির চাচী। : চলতি মাসের প্রথম দিনে বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানীর কাকরাইলের ভিআইপি রোডের ৭৯/১, মায়াকানন নামের নিজ বাসার ৫ তলায় খুন হয় মা-ছেলে। নিজ ফ্ল্যাটের সামনের বারান্দায় ছেলে ও ঘরের ভেতর মায়ের লাশ পড়ে ছিল। মায়ের নাম শামসুন্নাহার ও ছেলে নাম শাওন। মা গৃহিণী। আর ছেলে সম্প্রতি ‘ও’ লেভেল পরীক্ষা দিয়েছে। পুলিশ বলছে, লাশ উদ্ধারের সময় তারা দেখেছে মায়ের গলায় ছুরির আঘাত ছিল আর ছেলের শরীর ছিল রক্তাক্ত। কাকরাইলে একসঙ্গে মা-ছেলে খুন হওয়ার ১২ ঘন্টা ব্যবধানে উত্তর বাড্ডায় একসঙ্গে খুন হয় বাবা-মেয়ে। গত বৃহস্পতিবার সকালে বাড্ডার হোসেন মার্কেট এলাকার ময়নারটেকের একটি বাসা থেকে বাবা ও মেয়ের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহতরা হলেনÑ জামিল শেখ (৪১) ও মেয়ে নুসরাত (৯)। ময়নাতদন্ত শেষে জানা গেছে, নিহত জামিলের মাথায় ভারি কোনো বস্তু দিয়ে একাধিক আঘাত করা হয়েছে। এর ফলে মাথার হাড় ভেঙে তার ব্রেইনে আঘাত লাগায় তার মৃত্যৃ হয়। আর মেয়ে নুসরাতকে নাক, মুখ চেপে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। জোড়া খুনের ঘটনা নতুন নয়, ২০১৫ সালে এমপি-পুত্রের গুলিতে রাজধানীতে জোড়া খুন হলেও সে ঘটনার এখনো বিচার হয়নি। বরং এ ঘটনায় গত রবিবার ২৯ অক্টোবর এমপি-পুত্র রনি জোড়া খুনের মামলায় নিজেকে আদালতে নির্দোষ দাবি করেছেন। ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আবু সালেহ উদ্দিন যুক্তিতর্কের শুনানির জন্য আগামী ১৫ নভেম্বর দিন ধার্য করেছেন। ২০১৫ সালের ১৩ এপ্রিল রাত পৌনে ২টার দিকে রাজধানীর নিউ ইস্কাটনে মাতাল অবস্থায় যানজটে বিরক্ত হয়ে এমপি পিনু খানের ছেলে বখতিয়ার আলম রনির গুলিতে অটোরিকশাচালক ইয়াকুব আলী ও রিকশাচালক আবদুল হাকিম খুন হন। রাতেই ইয়াকুব ও আব্দুল হাকিমকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ১৫ এপ্রিল রিকশাচালক হাকিমের মৃত্যু হয়। আর ২৩ এপ্রিল সিএনজিচালক ইয়াকুবের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনায় নিহত হাকিমের মা মনোয়ারা বেগম অজ্ঞাত কয়েকজনকে আসামি করে রমনা থানায় ওই বছর ১৫ এপ্রিল একটি হত্যামামলা দায়ের করেন। এ ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে বখতিয়ার আলম রনিকে আটক করে ডিবি পুলিশ। : এদিকে গতকাল শুক্রবার সকালে পোস্তগোলা বুড়িগঙ্গা সেতুর পূর্বপাশ থেকে একসঙ্গে তরুণ-তরুণী লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গত ৮ অক্টোবর রাতে রাজধানীর রামপুরা থানাধীন বনশ্রীর সি ব্লকের ৩৪ নম্বর বাড়িতে জান্নাতুল বুশরা সুমনা (২৫) নামে এক গৃহবধূ হত্যার ঘটনা ঘটে। গৃহবধূর স্বামী রাসেল জানান, তারা দুজনই আলাদা দুটি প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করেন। প্রতিদিনের মতো ওইদিন রাত ৯টার দিকে বাসায় এসে দরজা বন্ধ পান তিনি। তখন বেশ কয়েকবার তার (স্ত্রীর) ফোন নম্বরে কল করলেও ফোনটি রিসিভ করা হয়নি। তাছাড়া বাসার ভেতর থেকেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এ অবস্থায় দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি। ডাকাডাকির কিছুক্ষণ পরই হঠাৎ করে বাসার ভেতর থেকে একটি অজ্ঞাত লোক দৌড়ে বেরিয়ে যেতে দেখেন তিনি। পরে ভেতরে প্রবেশ করে দেখেন তার স্ত্রীর হাত দুটি পেছনের দিক থেকে বাঁধা। এবং অচেতন অবস্থায় পড়ে আছে। সে সাথে নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। তখন তাৎক্ষণিক বাসা থেকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এছাড়া গত মাসের ২৮ তারিখে রাজধানীর চকবাজার চাঁদনীঘাট এলাকায় বড়-ছোট দ্বন্দ্বে হাসান (১৬) নামে এক জেএসসি পরীক্ষার্থীকে ছুরি মেরে খুন করেছে প্রতিপক্ষ। এর আগে ৮ অক্টোবর রাজধানীতে টিকাটুলির কে এম দাস লেনের ১২/২ নং বাসা থেকে মাত্র কয়েক শ গজ দূরে হুমায়ুন সাহেবের বাড়ির সামনে ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্সের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র আবু তালহা খন্দকার।

মাসুদুর রহমান, দিনকাল

মন্তব্য করুন