গোদাগাড়ীতে বানিজ্যিক ভাবে টার্কি পালনে লাভবান নিহাল বহুমূখী কৃষি খামারের- রাজেশ

0
872

শামসুজ্জোহা বাবু গোদাগাড়ী প্রতিনিধি: নিহাল বহুমূখী কৃষি খামারের মালিক মোঃ এহসান কবির রাজেশ, বয়স: ৩৭ বছর। রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী উপজেলাধীন রাজাবাড়ী এলাকা থেকে ২ কিলোমিটার দূরে দেওপাড়া ইউনিয়নের চৈতন্যপুর গ্রামে খামারটি।

খামারের মালিক পেশায় প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক। ২০০১ সালে দাম্পত্য জীবনের শুরু হয়। স্ত্রী নিলুফার ইয়াসমিন (২৯) একজন গৃহিণী। মেয়ে রিশাত কবির (১৩) অষ্টম শ্রেণীতে ও ছেলে নিহাল কবির (১০) পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ে। বর্তমানে একটি সুখী পরিবার। রাজেশ ২০১০ সালে চাকুরীতে যোগদান করেন। লেখাপড়ার পাশাপাশি বাড়ীর আশে পাশে বাগানের শখ ছিল তার। কিন্তু ২০০৯ সালে তার মা মারা যাওয়ার পরে অনেকটাই ভেঙ্গে পড়ে। অভিভাবক শূন্য হয়ে পড়ে। সংসারের তাড়নায় স্ত্রীর প্রেরণায় ২০১৫ সালে শশুর বাড়ী থেকে ৩ লক্ষ টাকা ধার নিয়ে ৪ বিঘা জমি লীজ ও ২ বিঘা নিজস্ব জমিতে পেয়ারা ও পেপে বাগান শুরু করে। এটাই তার প্রথম পথ চলা। পেয়ারা ও পেপে বাগান শুরু করার পর মাথায় চিন্তা আসে বাগানের ঘাসগুলো পরিত্যক্ত হয়ে যাচ্ছে।

এই ঘাসগুলো কাজে লাগা যায় কিভাবে। তারই আলোকে কিছুদিন পর গরু ও টার্কি পালন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এরপর ৫ টি গাভীসহ মোট ১৪ টি গরু ও ৪০ টি ৩ মাস বয়সের টার্কি বাচ্চা খামারে নিয়ে আসে। এর কিছুদিন পরেই আবার ৬০ টি একদিনের টার্কি বাচ্চা নিয়ে আসেন। ৭ থেকে ৮ মাস টার্কিগুলো লালন পালন করার পর মেয়ে টার্কিগুলো ৭ থেকে ৮ কেজি ও ছেলে টার্কিগুলো ১০ থেকে ১২ কেজিতে পরিনত হয় এবং ডিম দেওয়া শুরু করে। একটি টার্কি বছরে ২০০ টি ডিম দেয়। একটি ডিমের মূল্য ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। দুই বছরে প্রায় ৩০০ টি টার্কি পালন করে ডিম বিক্রি করেছে ২ থেকে ৩ লক্ষ টাকার এবং মাংসের জন্য টার্কি বিক্রি করেছে ৪ থেকে ৫ লক্ষ টাকার। আগামী মাসেই ১ হাজারটি টার্কি পালন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে রাজেশ। ৫০০ টি ১ দিনের টার্কি বাচ্চা আগামী মাসের ১০ তারিখে খামারে আসবে এবং ৫০০ টি টার্কির ডিম ফুটিয়ে নিজেই বাচ্চা তৈরি করবে। টার্কি বাচ্চা ফুটানোর জন্য প্রায় দেড় লক্ষ টাকা ব্যয়ে দুইটি ইনকিউবেটর মেশিন কিনেছে রাজেশ।

যা গোদাগাড়ীতে টার্কি চাষে ব্যাপক সাড়া ফেলবে এবং উজ্জল দৃষ্টান্ত হয়ে দাড়াবে রাজেশ। রাজেশকে দেখে বেকার যুবকেরা টার্কি চাষে ঝুকে পড়বে। পেয়ারা বাগান থেকে ২ বছরে প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা, গরু থেকে প্রায় ৭ থেকে ৮ লক্ষ টাকা আয় হয়েছে। শুধু তাই নয় পেপে বাগান থেকে বছরে ২ থেকে ৩ লক্ষ টাকা আয় হয়েছে। পেয়ারা বাগানের পাশাপাশি ৮ বিঘা জমিতে পেপে ও ৮ বিঘা জমিতে মালটা চাষ করছে রাজেশ। খুব সুন্দর মনোরম পরিবেশে গড়ে উঠেছে নিহাল বহুমূখী কৃষি খামার। কারণ সেখানে গরুর বর্জ পদার্থ গোবর বায়োগ্যাস প্লান্টের মাধ্যমে কর্মচারী ও গরুর খাবার রান্না করার কাজে ব্যবহার করে এবং অতিরিক্ত বর্জ্যগুলো পেয়ারা বাগানে সার হিসেবে ব্যবহার করে। টার্কি সবুজ প্রকৃতির ঘাস খেতে পছন্দ করে। এর বেশির ভাগই আসে পেয়ারা বাগান থেকে। তাই টার্কি চাষে খরচ স্বল্প হয় লাভবান বেশি। তাই দুই বছরে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছে রাজেশ। খাদ্য মানুষের শক্তির অন্যতম উৎস। উন্নত দেশ মানেই শুধু খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়, এর পাশাপাশি প্রয়োজন সুষম পুষ্টিকর খাদ্য। পুষ্টিকর খাদ্যের ক্ষেত্রে আমাদের যে বিষয়টির বেশি মুখোমুখি হতে হচ্ছে তা হলো আমিষের সংকট। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং বিশ্ব খাদ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী মানবদেহে শক্তির ১০ থেকে ১৫ শতাংশ আসা উচিৎ আমিষ থেকে।

আর আমিষ কমপক্ষে ২০ শতাংশ আসতে হবে প্রাণিজ আমিষ থেকে। তাই টার্কিতে যে পরিমান আমিষ উৎস আছে তা আমাদের দেহে প্রচুর উপযোগী। রাজেশ বলেন, আমার উদ্দেশ্য শুধু অর্থ উপার্যন নয়, নিজে স্বাবলম্বী হয়ে আরও কয়েকজন বেকারের কর্মসংস্থান তৈরি করা। আমার এখানে প্রায় প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ জন শ্রমিক কাজ করে। আর ২ জন কর্মচারী ২০ হাজার টাকা বেতনে স্থায়ী কর্মরত আছে। আমি যে পরিমাণ অর্থ উপার্যন করেছি তাতে আমি সন্তুষ্ট। তিনি আরও বলেন, যদি উন্নত প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও সহযোগীতা পাই তবে আমার খামারের প্রসারতা আরও বৃদ্ধি পাবে। এই পর্যন্ত আমি প্রানিসম্পদ ও কৃষি অফিস থেকে কোন প্রকার পরামর্শ ও সহযোগীতা পাই নি। যদি পরামর্শ ও সহযোগীতা পাই তবে টার্কি পালন দিনে দিনে বৃদ্ধি পাবে। মেশিনের যান্ত্রিক ত্রæটি হলে মেশিন চালাতে পারি না। মেরামত করার জন্য ঢাকায় যেতে হয়। কোন প্রতিষ্ঠান থেকে কারিগরি সহায়তা পেলে টার্কির বাচ্চা উৎপাদন বৃদ্ধি করতে সক্ষমতা অর্জন করবো। এই অর্জন শুধু আমার না এই অর্জন পুরো গোদাগাড়ীবাসীর।

প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা: সাইফুল ইসলাম বলেন, গোদাগাড়ীতে প্রথম টার্কি পালন করছে নিহাল বহুমূখী কৃষি খামার। তবে এর দেখাদেখি কয়েকজন খামারী টার্কি চাষ শুরু করেছে। এগুলোর তালিকা তৈরি করা হচ্ছে এবং টার্কির ভ্যাকসিন, প্রয়োজনীয় ঔষধ রক্ষনাবেক্ষণ নিয়মাবলী, খাবার প্রস্তুত ইত্যাদি প্রয়োজনে সরবরাহ করা হবে। শীতের সময় এর রোগবালাই বেশি হয়। তাই শীতের সময় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য পরামর্শ প্রদান করা হবে। আমি আশা করছি, টার্কি পালনে উল্লেখ্যযোগ্য ভূমিকা রাখবে রাজেশ। টার্কির মাংস খুব পুষ্টিকর ও সুস্বাদু এটা সবার মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। তাহলেই টার্কি চাষীরা লাভবান হবে।

 

মন্তব্য করুন